ফিলিস্তিন ইস্যুতে মার্কিন র্যাপার ম্যাকলমোরকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হলিউড ও সংগীতাঙ্গনের তারকাদের বিভাজন। ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলার পর এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে বাদ পড়েন ম্যাকলমোর। এরপর তাঁর সমর্থনে ট্যুর থেকে সরে দাঁড়ান ফিনিয়াস, লুকাস গ্রাহাম, অ্যারন রো ও আইরিশ ব্যান্ড বিওগা। এর মধ্যেই নিজের ট্যুর থেকে পাওয়া ১০ লাখ ডলার ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় দান করার ঘোষণা দিয়েছেন ম্যাকলমোর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ম্যাকলমোর জানান, এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে পাওয়া তাঁর পুরো ১০ লাখ ডলার ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় কাজ করা ছয়টি সংগঠনের মধ্যে দেওয়া হবে। এগুলো হলো—প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ড, হিল প্যালেস্টাইন, গাজা স্যুপ কিচেন, মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস, ইউএনআরডব্লিউএ ইউএসএ ন্যাশনাল কমিটি এবং আনেরা।
এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে পারফর্ম করার সময় ম্যাকলমোর ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বলে বক্তব্য দেন। গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের মানুষের কথা উল্লেখ করে তিনি তাঁদের ভুলে না যাওয়ার কথাও বলেন। এর পরই তাঁর ট্যুরে থাকা নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরে এড শিরানের উত্তর আমেরিকা সফরের বাকি অংশ থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। শিরান জানিয়েছেন, ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর ছিল না; ভেন্যু মালিক ও আয়োজকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তিনি আলোচনা করেছিলেন।
ম্যাকলমোরের পাশে অন্য শিল্পীরাও
ম্যাকলমোরকে ট্যুর থেকে বাদ দেওয়ার পর একে একে সরে দাঁড়ান অন্য সহশিল্পীরা। মার্কিন সংগীতশিল্পী ফিনিয়াস জানান, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার কারণে কোনো শিল্পীকে নীরব করা উচিত নয় এবং তিনি ফিলিস্তিন ও সেখানকার মানুষের পাশে আছেন। ডেনিশ শিল্পী লুকাস গ্রাহামও ট্যুর থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। আইরিশ শিল্পী অ্যারন রো এবং ব্যান্ড বিওগাও একইভাবে ট্যুর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে ম্যাকলমোর তাঁর অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার জন্য নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফটকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরে ক্রাফট জানান, এড শিরান তাঁকে ফোন করে মানবিক সহায়তার জন্য ২০ লাখ ডলার দেওয়ার অনুরোধ করেন। ক্রাফটও ২০ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দেন। ফলে শিরান ও ক্রাফটের পক্ষ থেকে মোট ৪০ লাখ ডলারের মানবিক সহায়তার ঘোষণা আসে। তবে এই অর্থ কোন নির্দিষ্ট সংগঠনের মাধ্যমে দেওয়া হবে, তা তখনও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ক্রাফট তাঁর বিবৃতিতে বলেন, সব মানুষের জীবন রক্ষা করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য কাজ করা সংগঠনগুলোর প্রতি নিজের দীর্ঘদিনের সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ম্যাকলমোর বলেন, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে রাখতে চান না; বরং গাজার মানুষের দুর্ভোগ ও মানবিক সংকটের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে চান।
শিরানকে ঘিরে রজার ওয়াটার্সের সমালোচনা
ম্যাকলমোরকে ঘিরে বিতর্কে মুখ খুলেছেন পিঙ্ক ফ্লয়েডের সহপ্রতিষ্ঠাতা রজার ওয়াটার্স। ফিলিস্তিন ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে সরব এই সংগীতশিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাকলমোরের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান এবং এড শিরানের অবস্থানের সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে শিরান জানিয়েছেন, ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি নেননি। তাঁর ভাষ্য, ভেন্যু মালিক ও আয়োজকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় আলোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত আয়োজকরাই সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারকাদের বিভাজন নতুন নয়
ম্যাকলমোরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এলেও ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ইস্যুতে হলিউড ও সংগীতাঙ্গনের তারকাদের অবস্থানগত পার্থক্য কয়েক বছর ধরেই প্রকাশ্যে এসেছে। কেউ ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও গাজায় যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেছেন, আবার কেউ ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও হামাসের হাতে জিম্মিদের মুক্তির দাবিকে সামনে এনেছেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে মেক্সিকান অভিনেত্রী মেলিসা বারেরাকে ‘স্ক্রিম ৭’ থেকে বাদ দেয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান স্পাইগ্লাস। ফিলিস্তিনপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’সহ বিভিন্ন শব্দে বর্ণনা করার পর এই সিদ্ধান্ত আসে। স্পাইগ্লাস জানায়, ইহুদিবিদ্বেষ ও ঘৃণাত্মক বক্তব্যের বিরুদ্ধে তাদের নীতি রয়েছে। বারেরা অবশ্য ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখার বিরোধিতা করেন।
একই সময়ে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন ফিলিস্তিনপন্থী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার পর হলিউডের ট্যালেন্ট এজেন্সি ইউটিএর সঙ্গে সম্পর্ক হারান। তাঁর কিছু বক্তব্য নিয়ে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ ওঠে। পরে সারান্ডন নিজের একটি মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়া—দুটিরই বিরোধিতা করার কথা জানান।
হলিউডের এজেন্সি সিএএর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহা দাখিলও গাজা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা মন্তব্যের পর বিতর্কে পড়েন। তাঁর একটি পোস্টে গাজার পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে তিনি সিএএর বোর্ড থেকে সরে দাঁড়ান এবং মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান।
ফিলিস্তিনের পক্ষে যেসব তারকা
ফিলিস্তিনিদের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলা তারকাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ-আলবেনীয় সংগীতশিল্পী দুয়া লিপা, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মডেল বেলা হাদিদ, অভিনেতা মার্ক রাফালো ও র্যামি ইউসুফ। দুয়া লিপা গাজায় যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেছেন। বেলা হাদিদ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সরব।
র্যামি ইউসুফ ২০২৪ সালের অস্কারে ‘Artists for Ceasefire’ লেখা পিন পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। একই বছর অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম গাজায় যুদ্ধবিরতি, ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্তির আহ্বান জানান।
‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ ও ‘স্নো হোয়াইট’ অভিনেত্রী র্যাচেল জেগলারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিকবার ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লিখে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছেন। তাঁর অবস্থান নিয়ে আলোচনার আরেকটি কারণ ছিল ‘স্নো হোয়াইট’ ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ইসরায়েলি অভিনেত্রী গাল গ্যাদত।
ইসরায়েলের সমর্থনেও সরব তারকারা
অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সাত শতাধিক হলিউড অভিনেতা, নির্মাতা ও বিনোদনজগতের ব্যক্তি একটি খোলাচিঠিতে হামলার নিন্দা এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির দাবি জানান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন গাল গ্যাদত, মাইকেল ডগলাস, মার্ক হ্যামিল, জেমি লি কার্টিস, হেলেন মিরেন, জেরি সাইনফেল্ড, ক্রিস পাইন ও জ্যাকারি লেভি। অভিনেত্রী ও কমেডিয়ান অ্যামি শুমারও বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
ফলে গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে হলিউড এবং আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে তারকাদের অবস্থান এক নয়। বরং যুদ্ধ, মানবিক সহায়তা, ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং শিল্পীদের রাজনৈতিক বক্তব্য—এসব প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান ক্রমেই প্রকাশ্য ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ম্যাকলমোরকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই বিভাজনকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে

