নিচে ধ্বংসস্তূপ, চারদিকে বন্যার স্রোত আর ভূমিধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া জনপদ। কোথাও কাদার স্তর, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মরদেহ। আর সেই মৃত্যুর উপত্যকার ওপর দিয়ে দিনের পর দিন উড়ে চলেছেন একজন নারী। তাঁর লক্ষ্য একটাই—যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা। নেপালের প্রথম নারী হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী মাত্র ছয় দিনে পরিচালনা করেছেন ১০০টিরও বেশি উদ্ধার অভিযান।
নেপালজুড়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে যখন একের পর এক এলাকা বিপর্যস্ত, তখন সবচেয়ে দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর আকাশে অবিরাম উড়ে চলেছেন ৪১ বছর বয়সী এই উচ্চ-উচ্চতার উদ্ধারকারী পাইলট। বিশেষ করে রাসুয়া জেলার বন্যাবিধ্বস্ত তিমুরে এলাকায় তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে একের পর এক উদ্ধার অভিযান।
হিমালয়ের কঠিন ভূখণ্ডে বহু বছর ধরে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া প্রিয়া অধিকারী এবার নেপালের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছেন। সিএনএনের অ্যান্ডারসন কুপারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই অভিযানকে তাঁর পেশাগত জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মিশনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রিয়ার মতে, বর্তমান দুর্যোগ মোকাবিলা ২০১৫ সালের ভয়াবহ নেপাল ভূমিকম্পের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন। কারণ এবারের ধ্বংসযজ্ঞের বড় একটি অংশ সংকীর্ণ উপত্যকাজুড়ে কেন্দ্রীভূত। ফলে উদ্ধারকাজে হেলিকপ্টার চালানো যেমন কঠিন, তেমনি নিরাপদে অবতরণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কে এই প্রিয়া অধিকারী?
প্রিয়া অধিকারী নেপালের একজন অভিজ্ঞ উচ্চ-উচ্চতার হেলিকপ্টার পাইলট। বছরের পর বছর ধরে তিনি হিমালয় অঞ্চলে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
তাঁর অভিযানের তালিকায় রয়েছে চরম উচ্চতায় আটকে পড়া বা আহত পর্বতারোহীদের উদ্ধার। কখনো কখনো তাঁর ফ্লাইট প্রায় ৬ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
তবে পাইলট হওয়ার পথটি তাঁর জন্য শুরু থেকেই নির্ধারিত ছিল না।
প্রিয়া পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কেবিন ক্রু হিসেবেও কাজ করেছেন। একবার হেলিকপ্টারে আনন্দভ্রমণের সময় উড্ডয়নের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই পরবর্তীতে হেলিকপ্টার চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে ফিলিপাইনে যান তিনি।
প্রয়োজনীয় উড্ডয়ন ঘণ্টা ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ২০১৭ সালে তিনি পূর্ণকালীন হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কাজ শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ-উচ্চতার অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন।
বর্তমান উদ্ধার অভিযান কতটা কঠিন, তার একটি বড় উদাহরণ তিমুর এলাকা। সেখানে প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার বিভিন্ন উদ্ধার মিশনে অংশ নিচ্ছে।
কখনো পরিস্থিতি এমন হয় যে একই ছোট এলাকায় একসঙ্গে পাঁচ বা ছয়টি হেলিকপ্টার অবতরণ করতে হচ্ছে।
এমন অবস্থায় সামান্য ভুলও ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই পাইলটদের প্রতিনিয়ত রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ও গতিবিধি সমন্বয় করতে হচ্ছে। কে কোথায় যাচ্ছে, কোন হেলিকপ্টার কোথায় নামবে এবং সবাই যেন একই গন্তব্যে গিয়ে ভিড় না করে—এসব বিষয়ও সমন্বয় করতে হচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে।
প্রিয়ার জন্য শুধু আকাশের পরিস্থিতিই বিপজ্জনক নয়। মাটিও তৈরি করছে বড় ঝুঁকি।
আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর দুর্গত এলাকার অনেক জায়গায় পুরু কাদার স্তর জমেছে। আকাশ থেকে এসব জায়গাকে শক্ত ও সমতল জমি মনে হতে পারে। কিন্তু হেলিকপ্টার অবতরণের পর সেই মাটি আদৌ বিমানটির ওজন ধরে রাখতে পারবে কি না, তা সবসময় বোঝা সম্ভব হয় না।
প্রিয়া জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় মাটি এতটাই অস্থিতিশীল যে হেলিকপ্টার অবতরণের পর ইঞ্জিন বন্ধ করাও নিরাপদ নয়। ফলে উদ্ধারকারী দলকে দ্রুত কাজ শেষ করতে হয় এবং জীবিতদের হেলিকপ্টারে তুলে নেওয়ার সময়ও ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়।
অর্থাৎ প্রতিটি উদ্ধার অভিযানেই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে পাইলটদের।
হেলিকপ্টার নিয়ে তিমুরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় প্রিয়া যে দৃশ্য দেখেছেন, তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
তিনি বন্যায় বিধ্বস্ত পুরো এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহ দেখেছেন। আবার সেই একই ধ্বংসের মধ্যে হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় থাকা জীবিত মানুষদেরও দেখেছেন।
ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও জীবিতদের অপেক্ষা তাঁর কাছে ছিল আশার প্রতীক।
উদ্ধার অভিযানের প্রথম দুই দিনেই তিমুর এলাকা থেকে ২০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়। এ কাজে নেপাল সেনাবাহিনীর অগাস্টা হেলিকপ্টারসহ বেশ কয়েকটি বিমান অংশ নেয়।
এত ভয়াবহতার মধ্যেও প্রিয়া অধিকারীর জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছেন বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো।
তিনি স্মরণ করেন, যখন তাঁর হেলিকপ্টার কোনো দুর্গত এলাকায় অবতরণের জন্য নিচে নামে, তখন চারপাশে মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁরা হেলিকপ্টারের দিকে হাত নাড়েন। সেই মুহূর্তে প্রিয়া তাঁদের যে বার্তাটি দিতে চান, তা খুবই সহজ—তাঁরা বেঁচে গেছেন এবং তাঁদের উদ্ধারের জন্য সাহায্য এসেছে।
প্রিয়া বলেন, যতবারই আমি নামতে যাই, দেখি চারপাশে মানুষ আছে এবং তারা হাত নাড়ছে। আমি বলি, আপনারা বেঁচে গেছেন।
এই কয়েকটি শব্দই যেন ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে আটকে পড়া মানুষগুলোর জন্য নতুন আশার বার্তা হয়ে উঠেছে।
উদ্ধার অভিযান শেষ করে দুর্গত এলাকা ছেড়ে আসার পরও অনেক মানুষের কথা প্রিয়ার মনে থেকে গেছে।
তিনি রাধিকার বাবা-মাকে খুঁজে বের করার চেষ্টার কথা স্মরণ করেছেন। রাধিকা একজন আমেরিকান-ভারতীয় নারী, তাঁর পরিবারও এই দুর্যোগের মধ্যে আটকা পড়েছিল।
এ ছাড়া তিমুরে আটকে পড়া দুজন নেপালি পুরুষেরও সন্ধান করেছিলেন তিনি। তাঁদের একজন ইশা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অন্যজন তিমুরের একটি ব্যাংকে কাজ করতেন।
এই মানুষগুলো তাঁর পরিবারের কেউ নন। তারপরও আকাশ থেকে ধ্বংসযজ্ঞ ও মৃতদেহ দেখার পর তাঁদের সঙ্গে এক ধরনের মানসিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন প্রিয়া। তাঁদের কী হয়েছে, তাঁরা বেঁচে আছেন কি না—এসব প্রশ্ন তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে।
এবারের উদ্ধার অভিযানের ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে দুর্গত এলাকায় জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মৃতদেহও উদ্ধার করতে হচ্ছে।
প্রিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে মৃতদেহ বহনের ব্যাগ এখন অন্যতম জরুরি সরবরাহে পরিণত হয়েছে।
তবে এসব ভয়াবহতার মধ্যেও তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জীবিত মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
দিনের পর দিন প্রায় একটানা উড্ডয়ন ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে প্রিয়া এবং তাঁর সহকর্মী পাইলটরা যে প্রচণ্ড ক্লান্ত, সেটিও স্বীকার করেছেন তিনি।
তবে এই ক্লান্তির মধ্যেও অভিযান থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে থাকা মানুষের জন্য হেলিকপ্টারই অনেক সময় একমাত্র উদ্ধারপথ।
সিএনএনকে প্রিয়া বলেন, এতগুলো ফ্লাইট চালানোর কারণে আমাদের বেশিরভাগই খুব ক্লান্ত। আমাদের এর জন্যই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস যখন একের পর এক জনপদকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, তখন ধ্বংসের ওপর দিয়ে উড়ে চলা প্রিয়া অধিকারীর হেলিকপ্টার হয়ে উঠেছে বহু মানুষের কাছে আশার প্রতীক। জীবিতদের খুঁজে বের করা, তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং নিখোঁজদের সন্ধান—সবকিছুর মাঝেই তাঁর লক্ষ্য একটাই, যতটা সম্ভব জীবন বাঁচানো। এনডিটিভি

