spot_img

যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে ১৫১ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এখন চীন

অবশ্যই পরুন

একসময় দারিদ্র্য, আফিমের বিস্তার ও বিদেশি শক্তির আধিপত্যে জর্জরিত চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। শিল্পায়ন, রপ্তানি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর ভর করে দেশটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্বের ১৫১টি দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এখন চীন। দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের এই উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবকেও অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্লেষণধর্মী তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট ২০২৫ সালের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে। এ জন্য তারা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ডিরেকশন অব ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য ব্যবহার করেছে।

১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার সময় দেশটির অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর ও দরিদ্র। পরবর্তী সময়ে শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের আদলে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।

তবে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে বাজারমুখী সংস্কার শুরুর পর। কৃষিতে উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের মাধ্যমে চীনের অর্থনীতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে।

এরপর ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেওয়ার পর চীনের বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়ে। দ্রুত শিল্পায়ন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ফলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করত মাত্র ৩৩টি দেশ। দুই দশকের কিছু বেশি সময় পর সেই সংখ্যা বেড়ে ১৫১-তে দাঁড়িয়েছে।

এর অর্থ, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্য চীন এখন শুধু পণ্য আমদানি বা রপ্তানির একটি উৎস নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার ও সরবরাহকারী।

বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য ও মধ্যবর্তী পণ্যের বড় অংশ চীন থেকে আসে।

চীনের ওপর আমদানি-নির্ভরতার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কম্বোডিয়া। দেশটির মোট পণ্য আমদানির ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশই আসে চীন থেকে। মিয়ানমারের আমদানির ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পেরুর ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ আসে চীন থেকে।

এশিয়ার বাইরে অস্ট্রেলিয়ার মোট পণ্য আমদানির ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্রাজিল ও চিলির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাশিয়ার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ আসে চীন থেকে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে এই হার ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, জাপানের ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্য আমদানির ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কানাডার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ আসে চীন থেকে। ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জার্মানির ১২ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ১২ দশমিক ২ শতাংশ, ইতালির ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং ফ্রান্সের ৮ দশমিক ৮ শতাংশ আমদানি আসে চীন থেকে।

এছাড়া, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারও চীন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২ হাজার ৬১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে দেশের মোট পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৪৪ কোটি ডলার।

অর্থাৎ ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য আমদানির প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে চীনের ওপর বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভরতা আরও বেড়েছে।

চীন থেকে বাংলাদেশ শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, বস্ত্র খাতের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্য ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁচামাল আসে চীন থেকে।

এদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়লেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা সহজে কমছে না।

স্মার্টফোন, ফোনের যন্ত্রাংশ, খেলনা ও ভিডিও গেম কনসোলসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে উড়োজাহাজ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ও জ্বালানি সরবরাহের মতো খাতে চীনেরও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই নির্ভরতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। চীনে কঠোর লকডাউনের কারণে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

চীন এখন শুধু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে থাকতে চাইছে না; উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে চীনা কোম্পানিগুলোর দ্রুত উত্থান এর অন্যতম উদাহরণ। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের বিওয়াইডি এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান কোম্পানি।

সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক পণ্য ও অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিরল মৃত্তিকা ও খনিজের ক্ষেত্রেও চীনের প্রভাব ব্যাপক। বিরল খনিজ খননের প্রায় ৭০ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯০ শতাংশ এবং চুম্বক তৈরির ৯৩ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প সরঞ্জামেও চীনা কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক বাজার লক্ষ্য করে এগোচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন তার বৈশ্বিক সম্প্রসারণের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

সব মিলিয়ে চীনের উত্থান শুধু একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার কাঠামো পরিবর্তনেরও উদাহরণ। চীনের ওপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্ভরতা যত বাড়ছে, ততই দেশটির সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। ভবিষ্যৎ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—চীনের এই প্রভাব আরও কতটা বাড়বে এবং অন্যান্য দেশ কীভাবে এই নির্ভরতা মোকাবিলা করবে।

সর্বশেষ সংবাদ

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে ৩৩%, প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে সর্বনিম্ন: রয়টার্স জরিপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে, যা তার বর্তমান মেয়াদে সর্বনিম্ন। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ