থাইল্যান্ডে স্কুলে বন্দুক হামলায় নিহত ১২ বছরের নাফাত চাইমারের শেষ বিদায়ে ভারী হয়ে উঠেছিল শোকের পরিবেশ। মেয়েকে হারিয়ে যখন বাবা-মা শোকে কাতর, ঠিক তখনই তাদের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসেন হামলাকারী কিশোরের বাবা। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নত করে মেয়েটির বাবা-মায়ের কাছে ছেলের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান তিনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) ব্যাংককের উত্তরে নন্থাবুরি প্রদেশের ওয়াট লাট প্লা ডুক মন্দিরে নাফাতের শেষকৃত্যের আগে এ হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হয় বহু মানুষ। সেখানে মেয়েটির স্বজনদের পাশাপাশি জড়ো হয়েছিলেন শত শত মানুষ। উপস্থিত ছিলেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী, শিক্ষক, সহপাঠী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
গত সপ্তাহে, ব্যাংককের উত্তর-পশ্চিমে দেবসিরিন নন্থাবুরি স্কুলে চালানো ভয়াবহ বন্দুক হামলার সবচেয়ে কম বয়সী নিহত শিক্ষার্থী ছিলেন নাফাত।
মেয়ের কফিনের সামনে যখন নাফাতের বাবা পংথন চাইমার ও মা শোকে ভেঙে পড়েছিলেন, তখন তাদের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসেন ১৪ বছর বয়সী হামলাকারী প্যাচাট ইমরুয়াংয়ের বাবা নিথি ইমরুয়াং। থাই সংস্কৃতিতে সম্মান ও ক্ষমা প্রার্থনার প্রচলিত অঙ্গভঙ্গি ‘ওয়াই’ করে মাথা নত করে কাঁদতে থাকেন তিনি।
পরে নাফাতের বাবা পংথন তাকে দুই হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দেন। ছেলের কৃতকর্মের জন্য নিথি ক্ষমা চাইলেও লজ্জা ও অনুশোচনায় তার মাথা তখনও নত ছিল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ১৪ বছর বয়সী প্যাচাট ইমরুয়াং প্রথমে নিজের দাদা ও দাদিকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর দেবসিরিন নন্থাবুরি স্কুলে গিয়ে আরও ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং ৩০ জনের বেশি মানুষকে আহত করে। পরে কিশোরটি নিজেকেও গুলি করে।
প্যাচাট তার দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছিল। মাত্র দুই বছর বয়সে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর থেকে সে তাদের সঙ্গে থাকত। তবে বাবা নিথি প্রতি সপ্তাহান্তে ছেলের সঙ্গে দেখা করতেন এবং তাকে অতিরিক্ত পড়াশোনার ক্লাসেও নিয়ে যেতেন।
শেষ দিকে ছেলের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন বলে জানান নিথি। তার ভাষ্য, ছেলেটি স্বভাবগতভাবেই শান্ত ও অন্তর্মুখী ছিল। নিজের কথা খুব একটা প্রকাশ করতো না। তবে হামলার আগে সে আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।
স্কুলের পড়াশোনা কেমন চলছে, এমন প্রশ্ন করলে প্যাচাট প্রায়ই ‘মোটামুটি’ বলে উত্তর দিত। এখন আর ছেলেকে এসব প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, এই বাস্তবতাই নিথিকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
নাফাতের শেষকৃত্যের আগে দ্য গার্ডিয়ানকে নিথি বলেন, একই সঙ্গে অনেক ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নিজের সন্তান ও বাবা-মাকে হারানোর কারণে তিনি যেমন শোকাহত, তেমনি নিজের ছেলের হাতে অন্য একটি পরিবারের সন্তান নিহত হওয়ায় অপরাধবোধও তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
বিশেষকরে, নাফাতের বাবা তার প্রতি যে সহানুভূতি ও মানবিকতা দেখিয়েছেন, সেটি তার অপরাধবোধ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান নিথি।
নাফাতের মৃত্যুতে পুরো থাইল্যান্ডেই শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। দেশটির রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন ও প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
মন্দিরের প্রার্থনাকক্ষে নাফাতের কফিনের পাশে রাখা ছিল রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের পাঠানো হলুদ রঙের পুষ্পস্তবক। পাশে ছিল রানি সুথিদার পক্ষ থেকে পাঠানো বেগুনি ও গোলাপি রঙের আরেকটি পুষ্পস্তবক। প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল এবং মন্ত্রিসভার আরও কয়েকজন সদস্যের পক্ষ থেকেও পাঠানো হয় পুষ্পস্তবক।
রোববার রাজপ্রাসাদ থেকে জানানো হয়, নিহত ও আহতদের পরিবারকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আহতরা রাজকীয় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা পাবেন। নিহতদের শেষকৃত্য ও দাহ অনুষ্ঠানেও রাজপরিবারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হবে।
নাফাতের কফিন ঘিরে সোমবার মন্দিরে জড়ো হন শত শত মানুষ। প্রার্থনায় অংশ নেন উপপ্রধানমন্ত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক ও নাফাতের বন্ধুরা। মন্দিরের ভেতরের জায়গা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় বাইরে ছাউনির নিচেও জায়গা নিতে হয় শোকাহত মানুষকে।
মন্দিরে নাফাতের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি রাখা হয়—শিশুকাল থেকে কৈশোরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো এক আত্মবিশ্বাসী কিশোরী হিসেবে তার বেড়ে ওঠার নানা স্মৃতি সেখানে ফুটে ওঠে। কোথাও গিটার হাতে, কোথাও মঞ্চে পারফর্ম করতে দেখা যায় তাকে।
নাফাত মাত্র তিন মাস আগে ওই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। সপ্তম শ্রেণির নতুন শিক্ষার্থীদের দলে ছিল সে। মেয়েকে নিয়ে বাবা পংথন বলেন, তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মেয়ের স্বপ্নগুলোর কথা।
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পর নাফাত একটি নৃত্য প্রতিযোগিতা ও থাই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। চলতি মাসের শেষ দিকে, একটি চিয়ারলিডিং প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার।
বাবার ভাষ্য, এসব কার্যক্রমে নাফাত খুব আগ্রহী ছিল। একসঙ্গে অনেক কিছু করলেও সবকিছু সামলে নিতে পারত সে। নিজের প্রতিভা ও সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে মেয়েটি খুব ভালোবাসত।
স্কুলে হামলার খবর পাওয়ার পর নাফাতের বাবা-মা বারবার মেয়ের ফোনে কল দিতে থাকেন। পরে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদের জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় নাফাতকে ফ্রানাংক্লাও হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
হামলার সময় নাফাত সাধারণত যে ভবনে থাকার কথা নয়, সেদিন সেখানে গিয়েছিল। তার এক শিক্ষক জানান, কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে টিকা নিতে গিয়েছিল সে।
টিকা নেওয়ার পর কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময়ই গুলির আঘাতে আহত হয় নাফাত।
কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর, গত শনিবার মারা যায় ১২ বছরের এই কিশোরী। তার মৃত্যুতে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নয়জনে—যার মধ্যে হামলাকারী নিজেও রয়েছে।
নাফাতের শিক্ষক তাকে একজন প্রাণবন্ত ও বিনোদনপ্রিয় শিক্ষার্থী হিসেবে স্মরণ করেছেন। তবে মেয়েকে হারানোর ঘটনায় স্কুলকে দায়ী করতে চান না তার বাবা পংথন।
তার মতে, এমন ঘটনা যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে—শুধু থাইল্যান্ডে নয়, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই।

