প্রশান্ত মহাসাগরে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছে চীন।
সোমবার (৭ জুলাই) এই পরীক্ষার পর যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বেইজিংয়ের আঞ্চলিক মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীনা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে একটি পরমাণুচালিত সাবমেরিন থেকে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এতে একটি ডামি ওয়ারহেড (পরীক্ষামূলক নকল ওয়ারহেড) ব্যবহার করা হয়েছিল। ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক জলসীমায় আঘাত হানে।
২০২৪ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষার পর এটিই চীনের প্রথম বড় কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি দেশটির বার্ষিক নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ। নিরাপত্তার স্বার্থে ক্ষেপণাস্ত্রটির মডেল কিংবা পতনের সুনির্দিষ্ট স্থান প্রকাশ করা হয়নি। বেইজিংয়ের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরীক্ষাটি পরিচালিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়নি বলেও দাবি করেছে চীন।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে এবং এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সলোমন দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে পড়েছে। তাদের মতে, এ পরীক্ষার মাধ্যমে চীন দূরপাল্লার পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা এবং সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও জোরালোভাবে প্রদর্শন করেছে।
চীনের এই পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা পুরো উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করছে, তখন চীন দ্রুত ও অস্বচ্ছভাবে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। তিনি বেইজিংকে অর্থবহ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় অংশ নেওয়ারও আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে চীনকে আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় যুক্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কোনো চুক্তিতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও বেইজিং সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং জানিয়েছেন, ক্যানবেরাকে পরীক্ষার বিষয়ে আগে থেকেই অবহিত করা হয়েছিল। তবে তিনি বলেন, চীনের দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার অভাব পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
জাপানের সংবাদ সংস্থা কিয়োডো জানিয়েছে, সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছাকাছি পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা বেইজিং আগে থেকেই টোকিওকে দিয়েছিল। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে পড়ে, তবুও এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান সরকার।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা অনাকাঙ্ক্ষিত। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে ‘এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর সিনিয়র ফেলো লায়েল মরিস বলেছেন, এই পরীক্ষা চীনের সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে দেশটি দেখিয়েছে যে, নিজস্ব উপকূলীয় জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান করেই দূরপাল্লায় কৌশলগত হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে চীনের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো চীনের সার্বভৌম অধিকার এবং বেইজিং বিশ্বের কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়। চীনের নৌবাহিনীর মুখপাত্র ওয়াং শুয়েমেংও পুনর্ব্যক্ত করেছেন, এটি একটি নিয়মিত সামরিক মহড়া এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগে থেকে জানানো হয়েছিল।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

