কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ১০৯ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা ২৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর মাধ্যমে জুন মাসে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরা বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮৩ জনে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত চার দিনে মোট ৩৬২ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে তাদের জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের একজন লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা জানান, একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র তাকে কম্বোডিয়ায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাঠায়। এ জন্য তিনি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ছাড়পত্রও নেন।
তবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসা দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে বাংলাদেশি দালালরা তাকে গ্রহণ করলেও পরে বৈধ কাজের ভিসার ব্যবস্থা না করে অর্থের বিনিময়ে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, সেখানে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে অনলাইন প্রতারণা চালাতে বাধ্য করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে মারধর, শারীরিক নির্যাতন এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো। স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নির্যাতনের জন্য আলাদা কক্ষও ছিল বলে তিনি জানান।
তার ভাষ্য, সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালালে প্রতারক চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যায় এবং তখনই তারা মুক্তি পান।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যাম এখন মানবপাচারের একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উন্নত দেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে পরে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হচ্ছে। যারা নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন না, তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
তিনি জানান, কম্বোডিয়ার সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। জুন মাসে ৫৮৩ জনের দেশে ফেরা প্রমাণ করে যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি এই মানবপাচারকারী চক্রের শিকার হয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন ভুক্তভোগী মামলা করেছেন।
শরিফুল হাসান এ ঘটনায় জড়িত দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রকে শনাক্ত করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে কাজের উদ্দেশ্যে ১৫ হাজার ৯২১ বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের দাবি, কাজ না পেয়ে বা প্রতারণার শিকার হয়ে এখনো কয়েক হাজার বাংলাদেশি সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তাদের অনেকেই জানান, উচ্চ বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশে পাঠানো হলেও বাস্তবে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুন মাসে ফিরে আসা ৫৮৩ জনের অনেকেরই বিএমইটির বৈধ ছাড়পত্র ছিল।
এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদেরও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে সাইবার প্রতারণায় বাধ্য করা হয়।
ব্র্যাক জানায়, পাচারকারী চক্র ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ ও কাস্টমার সার্ভিস অফিসারের মতো আকর্ষণীয় পদের বিজ্ঞাপন দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের প্রলুব্ধ করে। পরে তাদের বিদেশে নিয়ে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়।
থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ভিসার ধরন ভালোভাবে যাচাই করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ব্র্যাক।

