সাজনা যা বিশ্বে মোরিঙ্গা ওলিফেরা (Moringa oleifera) নামে পরিচিত। বহু শতাব্দী ধরে এটি খাদ্য ও ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর পাতা, ফুল, ফল, বীজ, শিকড় এবং বাকল বিভিন্ন পুষ্টি ও জৈব সক্রিয় উপাদানে সমৃদ্ধ।
সাজনা ওলেইফেরা (Moringa oleifera), যা ‘মিরাকল ট্রি’ বা ‘জীবন বৃক্ষ’ নামে পরিচিত, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি উদ্ভিদ। ঐতিহ্যগতভাবে এটি ক্ষত, ব্যথা, আলসার, লিভারের রোগ, হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং প্রদাহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
আধুনিক গবেষণায় সাজনার ফার্মাকোলজিক্যাল কার্যক্রম, জাতিগত চিকিৎসা (Ethnomedicine), ফাইটোফার্মাসিউটিক্যাল ফর্মুলেশন, ক্লিনিক্যাল সম্ভাবনা, ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান এবং বিষাক্ততাবিষয়ক দিকসমূহ পর্যালোচনা করে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী এটি ‘সুপার ফুড’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে সাজনার বিভিন্ন অংশের নির্যাসের মধ্যে রয়েছে:
লিভার সুরক্ষাকারী (Hepatoprotective), হৃদরোগ প্রতিরোধী (Cardioprotective), প্রদাহবিরোধী (Anti-inflammatory)
গুণাবলি।
উদ্ভিদের প্রায় সব অংশেই সক্রিয় জৈব উপাদান (Bioactive compounds) বিদ্যমান। এ পর্যন্ত ১০০-এরও বেশি রাসায়নিক যৌগ শনাক্ত করা হয়েছে, যেমন:
অ্যালকালয়েড, ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যানথ্রাকুইনোন, ভিটামিন, গ্লাইকোসাইড, টারপিন
এছাড়াও মুরামোসাইড এ ও বি এবং নিয়াজিমিন এ ও বি ( Muramoside A&B এবং Niazimin A&B) নামক নতুন যৌগ শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো:
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ক্যান্সারবিরোধী, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী, লিভার সুরক্ষাকারী, পুষ্টিবর্ধক গুণ প্রদর্শন করে।
সাজনা ওলেইফেরা বিশ্বের প্রায় সব উষ্ণ ও উপ-উষ্ণ অঞ্চলে জন্মায়। এর আদি নিবাস বলে মনে করা হয়: বাংলাদেশ,পাকিস্তান,ভারত ও আফগানিস্তান
সাজনা পরিবারের ১৩টি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে Moringa oleifera সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
এর ব্যবহার রয়েছে, পুষ্টি সরবরাহে, জৈব জ্বালানি (Biogas), সার উৎপাদনে, পশুখাদ্য হিসেবে।
সাজনা খরা সহ্য করতে পারে এবং স্বল্প খরচে উচ্চ পুষ্টি সরবরাহকারী উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত।
পুষ্টিগুণ
পাতায় রয়েছে: বিটা-ক্যারোটিন,ক্যালসিয়াম,পটাশিয়াম ও বিভিন্ন খনিজ।
শুকনো পাতায় প্রায় ৭০% ওলেইক অ্যাসিড থাকে, যা প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ঐতিহ্যগত ব্যবহার:
বাকল: আলসার, দাঁতের ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ
মূল: দাঁতের ব্যথা, কৃমি, পক্ষাঘাত
ফুল: আলসার, প্লীহা বৃদ্ধি
পাতা: অপুষ্টি দূরীকরণ
বীজ: বিভিন্ন রোগে ব্যবহৃত
বিশ্বব্যাপী গবেষণা
গবেষনায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, এটি দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ, দোআঁশ ও বেলে মাটিতে ভালো জন্মে।
ছাতার মতো বিস্তৃত শাখা
প্রতি গাছে বছরে ১৫,০০০–২৫,০০০ বীজ উৎপন্ন হতে পারে
ভৌগোলিক বিস্তার
সাজনা বর্তমানে পাওয়া যায়, এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, ল্যাটিন আমেরিকা, ফিলিপাইন, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া
ইত্যাদি অঞ্চলে।
এটি ২৫–৩৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভালো জন্মে।
ঐতিহ্যগত চিকিৎসা ব্যবহার: উদ্ভিদের প্রায় সব অংশ ব্যবহৃত হয়।
চিকিৎসাগত ব্যবহার: উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ, ডায়রিয়া, মূত্রবর্ধক, আমাশয়,কোলাইটিস,পাতার ব্যবহার,
পাতা দিয়ে তৈরি পেস্ট ব্যবহৃত হয়: মাথাব্যথা, ব্রংকাইটিস, প্রদাহ,চিকিৎসায়।
মূলের ব্যবহার: কিডনির পাথর, লিভারের রোগ, আলসার, প্রদাহ,
বীজের ব্যবহার: কোষ্ঠকাঠিন্য, টিউমার, প্রোস্টেট রোগ
ফার্মাকোলজিক্যাল কার্যকারিতা: গবেষণায় সাজনার মধ্যে নিম্নোক্ত কার্যকারিতা পাওয়া গেছে:
ক. অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল: বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে কার্যকর।
খ. প্রদাহবিরোধী: TNF-α কমায়, NF-κB কার্যকলাপ দমন করে
গ. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
মুক্ত মৌল (Free radicals) ধ্বংস করে:
৪. ক্যান্সারবিরোধী: টিউমার বৃদ্ধি কমায়, আওএস কমায়, স্তন ক্যান্সার কোষে কার্যকারিতা দেখা গেছে।
৫. লিভার সুরক্ষা: এএসটি, এএলটি ও এএলপির মাত্রা কমিয়ে লিভার রক্ষা করে।
৬. হৃদরোগ প্রতিরোধ: কোলেস্টেরল কমায়, হৃদপেশি সুরক্ষা দেয়।
৭. আলসার প্রতিরোধ: পাকস্থলীর অ্যাসিড কমায় এবং আলসার নিরাময়ে সাহায্য করে।
৮. ব্যথা ও জ্বর কমানো: বিভিন্ন প্রাণী পরীক্ষায় ব্যথানাশক ও জ্বরনাশক প্রভাব দেখা গেছে।
স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব:
সম্ভাব্য উপকারিতা:
আলঝাইমার রোগ,খিঁচুনি,উদ্বেগ,অনিদ্রা
ক্ষত নিরাময়: ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে।
রক্তস্বল্পতা: নারীদের হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করতে সহায়ক।
স্থূলতা প্রতিরোধ: বিএমআই কমায়, চর্বি বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: রক্তে গ্লুকোজ কমায়, ইনসুলিন কার্যকারিতা বাড়ায়।
উচ্চ রক্তচাপ: এসিই এনজাইমকে বাধা দিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
বিষাক্ততা (Toxicity)
গবেষণায় দেখা গেছে:
পাতা ২০০০ মিগ্রা/কেজি পর্যন্ত নিরাপদ, বীজ ৪০০০ মিগ্রা/কেজি পর্যন্ত তুলনামূলক নিরাপদ, অতিরিক্ত মাত্রায় যকৃতের এনজাইম বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সেবন এড়ানো উচিত।
ক্লিনিক্যাল গবেষণা
সাজনা নিয়ে ২৫টি ক্লিনিক্যাল গবেষণা হয়েছে।
উপকারিতা দেখা গেছে: অপুষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ,এইচআইভি, প্রজনন স্বাস্থ্য ও হাঁপানি রোগে।
হাঁপানি রোগীদের ক্ষেত্রে ৩ গ্রাম বীজগুঁড়া দিনে দুইবার ৩ সপ্তাহ সেবনে শ্বাসপ্রশ্বাসের উন্নতি দেখা গেছে।
ফাইটোকেমিস্ট্রি: সাজনায় ৯০টিরও বেশি জৈব সক্রিয় যৌগ শনাক্ত হয়েছে, যেমন:
ক. প্রোটিন
খ. অ্যামিনো অ্যাসিড
গ. ফেনলিক অ্যাসিড
ঘ. ক্যারোটিনয়েড
ঙ. অ্যালকালয়েড
চ. গ্লুকোসিনোলেট
ছ. ফ্ল্যাভোনয়েড
ঝ. স্টেরল
ঞ. টারপিন
ট. ট্যানিন
ঠ. স্যাপোনিন
ড. ফ্যাটি অ্যাসিড
ঢ. গ্লাইকোসাইড
ণ. পলিস্যাকারাইড
সাজনা একটি বহুমুখী ঔষধি ও পুষ্টিকর উদ্ভিদ। গবেষণায় এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহবিরোধী, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকারী, লিভার ও হৃদযন্ত্র সুরক্ষাকারী এবং সম্ভাব্য ক্যান্সারবিরোধী বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে অনেক ঐতিহ্যগত ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও সীমিত, তাই ভবিষ্যতে আরও উচ্চমানের ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন

