অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব বা দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার (০২ জুন) রাজধানীতে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ বিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোতে বাজেট বাস্তবায়ন দ্রুততর করা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নের লক্ষ্যেই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “বরাদ্দ কোনো সমস্যা নয়। আমাদের উদ্বেগ হলো, আমরা কত দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করতে পারি। বাজেট কেন বাস্তবায়িত হয় না এবং কোথায় প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, সে বিষয়ে গভীর পর্যালোচনার পর এই কর্মপন্থা তৈরি করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, সরকার প্রকল্প অনুমোদনের জন্য চারটি মানদণ্ড গ্রহণ করেছে: অর্থের সঠিক ব্যবহার, বিনিয়োগের উপর প্রতিদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত প্রভাব।
আমির খসরু বলেন, এসব মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ প্রকল্পগুলো অনুমোদন পাবে না। পাশাপাশি পূর্ববর্তী প্রশাসনের রেখে যাওয়া প্রায় ১,৩০০টি প্রকল্প এই মানদণ্ডে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অযোগ্য প্রকল্পগুলো বাতিল করা হবে এবং ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে।
ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার সংস্কার
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অনেক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে বেসরকারি খাতও চাপের মুখে রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পুনর্মূলধনীকরণ নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। জেপি মরগ্যানসহ কিছু আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তিনি আরও বলেন, আমানতকারীরা যখন আস্থা পাবেন যে প্রয়োজনমতো অর্থ উত্তোলন সম্ভব, তখন ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল হবে।
দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসইসি পুনর্গঠন
তিনি জানান, রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হবে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বাজেট কৌশল
মন্ত্রী বলেন, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং বিনিয়োগ সংকটের কারণে এবারের বাজেট প্রণয়ন জটিল হয়ে উঠেছে। সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের রেখে যাওয়া দুর্বল অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি উদ্যোগ
সরকার কৃষক কার্ড বিতরণসহ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও নারীদের সহায়তায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য, সৃজনশীল অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রবেশাধিকারের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা সহজীকরণে একক জানালা (single window) ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে অনুমোদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি উন্নয়ন ব্যয়ের দক্ষতা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে সুশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ ওশানগোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শ্রমিক কল্যাণ তহবিল সংস্কারের দাবি জানান। অন্যদিকে টেক্সটাইল খাতের নেতারা কারখানা বন্ধ ও শিল্প সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

