প্রচণ্ড গরমে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে মানুষের জীবন। সূর্যের তীব্র তাপ, গরম বাতাস আর দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করার কারণে মানুষের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। সে সময় এক গ্লাস পানি মানুষের অন্তরে যে প্রশান্তি এনে দেয়, তা হয়ত পিপাসার্ত মানুষের অন্তর থেকে দোয়া এনে দিতে পারে। বিশেষ করে পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, কৃষক- কঠোর পরিশ্রমে কাতর হয়ে পড়া এসব মানুষের জন্য কখনো কখানো এক গ্লাস পানি জীবনের পরশ বয়ে আনে। তৃষ্ণায় কাতর একজন মানুষের কাছে সামান্য পানি হয়ে ওঠে অমূল্য নিয়ামত।
‘পানির অপর নাম জীবন’-এটা নিছক একটি প্রবাদ নয়, বরং পবিত্র কোরআনেও এর সপক্ষে প্রমাণ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, আর আমি প্রানসম্পন্ন সবকিছুকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)
এমন বাস্তবতায় ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষকে পানি পান করানো শুধু মানবিক কাজ নয়, বরং এক মহান ইবাদত। সাহাবি সাদ ইবনে উবাদা (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করনে, কোন দান সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেন, পানি পান করানো। (নাসায়ি, হাদিস : ৩৬৬৫)
এই হাদিসটি প্রমাণ করে, দানের অনেক ধরন থাকলেও পানির দান বিশেষভাবে শ্রেষ্ঠ। কারণ এটি সরাসরি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে। প্রচণ্ড গরমে যখন তৃষ্ণা মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন এক গ্লাস পানি তার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হয়ে দাঁড়ায়।
তাই মুমিনদের উচিত, সহজলভ্য এই উত্সটিকে কাজিয়ে পরকাল সাজানোর চেষ্টা করা। প্রচণ্ড এই গরমের মৌসুমে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর সাহায্যে এগিয়ে আসা। কারণ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তাঁর যেকোনো মাখলুকের সেবাই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এক ব্যক্তি একটি কুকুরকে পানি পান করানোর উসিলায় মহান আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়েছেন।
হাদিস শরীফে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, একজন লোক রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লাগল। সে কূপে নেমে পানি পান করল। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেল যে, একটা কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চাটছে। সে ভাবল, কুকুরটারও আমার মতো পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামল এবং নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে সেটি ধরে উপরে উঠে এসে কুকুরটিকে পানি পান করাল। আল্লাহ তাআলা তার আমল কবুল করলেন এবং আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই পুণ্য রয়েছে। (বুখারি, হাদিস: ২৩৬৩)
এই হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, শুধু মানুষ নয়, যেকোনো তৃষ্ণার্ত প্রাণীকেও পানি পান করালে আল্লাহ তাআলা তার প্রতিদান দেন। এটি ইসলামের দয়ার শিক্ষা এবং পানির গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
প্রচণ্ড গরমে পানি বিতরণ করা তাই শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ইমানি চেতনার বহিঃপ্রকাশ। রাস্তার পাশে পানির পাত্র রাখা, পথচারীদের মধ্যে ঠান্ডা পানি বিতরণ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এমনকি কেউ যদি বাড়ির সামনে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করে, তাহলে সে হাদিসে বর্ণিত কূপ খননের সওয়াব পাবে ইনশাআল্লাহ।
হাদিসে এসেছে, আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাতটি আমলের সওয়াব বান্দার মৃত্যুর পর কবরে থাকা অবস্থায় তার জন্য জারি থাকে। যে ব্যক্তি কাউকে বিদ্যা শিক্ষা দিবে, অথবা নদী খনন করবে, অথবা কুপ খনন করবে, অথবা খেজুর গাছ লাগিয়ে যাবে, অথবা মসজিদ তৈরী করবে, অথবা পবিত্র কোরআনের উত্তরাধিকার রেখে যাবে অথবা এমন সন্তান রেখে যাবে যে মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’ (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস : ৭৩)
বর্তমান সময়ে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, তাই এই সময় এ ধরনের আমলের গুরুত্বও আরও বেড়ে গেছে। আমাদের সামান্য উদ্যোগ অসংখ্য মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে সাহায্য করতে পারে। এতে যেমন মানুষের দোয়া পাওয়া যাবে, তেমনি আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ।

