মানুষের জীবনে কিছু সময় আসে, যখন আসমানি দরজা যেন দুনিয়ার আরও কাছে নেমে আসে, দোয়া যেন দ্রুত কবুল হয়, আর সামান্য আমলও হয়ে ওঠে অসীম সওয়াবের কারণ। মুসলিম উম্মাহর জন্য রমজান ঠিক এমনই এক মহিমান্বিত সময়। এটি রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস।
এই মাসে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়। আর যদি সেই রমজান মাসে আল্লাহর ঘরকে কেন্দ্র করে ওমরার মতো জান ও মালের সমন্বিত মহৎ ইবাদত সম্পাদিত হয়, তাহলে তার মর্যাদা কতটা হতে পারে, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভাষাতেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক আনসারি মহিলাকে বলেছিলেন, ‘রমজান মাসে একটি ওমরা আদায় করা একটি হজের সমতুল্য।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আমার সঙ্গে একটি হজ আদায় করার সমতুল্য।’ (বুখারি, হাদিস: ১৮৬৩)
এই হাদিসটি রমজানে ওমরার মর্যাদার ভিত্তি। তবে আলেমগণ একমত যে, এখানে সওয়াবের দিক থেকে সমতার কথা বলা হয়েছে, ফরজ হওয়ার দিক থেকে নয়। অর্থাত্ রমজানের ওমরা ফরজ হজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় না। ইমাম নববী (রহ.) লিখেছেন, ‘এর অর্থ হলো সওয়াবের ক্ষেত্রে সমতা, ফরজ হজের বিকল্প নয়।’ (আন-নববি, শরহু সহিহ মুসলিম, ৯/২)
সময়ের মর্যাদা আমলের মর্যাদা বাড়ায়
ইসলামের একটি মেৌলিক নীতি হলো, সময় ও স্থানের মর্যাদা অনুযায়ী আমলের মূল্য বৃদ্ধি পায়। রমজান এমন এক মাস, যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস; যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
মহানবী (সা.) বলেছেন, রমজান মাস আসলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। (বুখারি, হাদিস: ১৮৯৯)
যখন একটি সময় নিজেই বরকতপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সেই সময়ে সম্পাদিত ইবাদতও বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। আর ওমরা এমন একটি ইবাদত, যা শরীর, অর্থ, সময় ও হূদয়ের একসঙ্গে নিবেদন দাবি করে। তাই রমজানের পবিত্র সময় এবং হারামাইনের পবিত্র স্থান; এই দুই মর্যাদা একত্রিত হলে তার সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
গুনাহ মাফের এক শক্তিশালী মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক ওমরার পর আর এক ওমরা উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা।’ (বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩)
অর্থাৎ দুই ওমরার মধ্যবর্তী সময়ের ছোট গুনাহগুলো মাফ হয়ে যায়।
অতএব, যখন রমজানের মাগফিরাত এবং ওমরার কাফফারার ফজিলত একত্রিত হয়, তখন এটি মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ হয়ে ওঠে।
অন্তরের পরিবর্তন ও তাকওয়ার বিকাশ
রমজানের মূল লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
মক্কা ও মদিনার পবিত্র পরিবেশে রোজা, তারাবি, কোরআন তিলাওয়াত এবং কাবা শরিফের সামনে ইবাদত; এসব একজন মানুষের অন্তরে গভীর পরিবর্তন আনে। ইবনে রজব আল-হাম্বলি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, ‘পবিত্র স্থান ও পবিত্র সময় একত্রিত হলে ইবাদতের প্রভাব অন্তরে অধিক গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।’ (ইবনু রজব, লাতায়িফুল মা ‘আরিফ, পৃ. ২৮০)
নবীজির বিশেষ উত্সাহ
হাদিসে বর্ণিত উম্মে সিনান (রা.)-এর ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি সামর্থ্যের অভাবে হজে যেতে না পারায় তখন নবীজি (সা.) তাকে রমজানে ওমরার সুসংবাদ দেন। আলেমগণ বলেন, এটি উম্মতের জন্য একটি বড় সান্ত্বনা। যে ব্যক্তি কোনো কারণে হজে যেতে না পারেন, তিনি রমজানে ওমরার মাধ্যমে বিশাল সওয়াব অর্জনের সুযোগ পেতে পারেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৩/৬০৫)
এক সফরে বহু প্রাপ্তি
রমজানের ওমরা কেবল একটি ইবাদত নয়, এটি আত্মার পুনর্জাগরণের এক সফর। এটি মানুষকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। সেখানে ইখলাস বাড়ে, দোয়া কবুলের আশা জাগে, গুনাহের জন্য অনুতাপ জন্মায় এবং নতুন জীবনের প্রেরণা তৈরি হয়।
কাজেই যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের জন্য এটি জীবনের এক বিরল সুযোগ। কারণ এমন সময়, এমন স্থান এবং এমন ইবাদতের সমন্বয় সারা বছর থাকেনা। আল্লাহ আমাদের সকলকে পবিত্র মাসে এই মহান সওয়াবের অংশিদার হওয়ার তাওফিক দান করুন।

