আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে পাকিস্তান। তবে দেশটির ভেতরে ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদ, সীমান্ত অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে টেকসই করা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
চলতি ফেব্রুয়ারির ২ থেকে ৪ তারিখ পর্যন্ত লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের সেনানায়ক ও স্বঘোষিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) প্রধান খলিফা হাফতার পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরে সফর করেন। সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকটি আপাতদৃষ্টিতে রুটিন মনে হলেও এটি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে (মেনা) পাকিস্তানের বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা কূটনীতির দিকটি স্পষ্ট করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান হাফতারের বাহিনীর সঙ্গে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এর আওতায় ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ও ১২টি সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহ করা হবে। প্রায় আড়াই বছরে বাস্তবায়িত এই চুক্তি লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে সামরিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গেও পাকিস্তান ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র সরবরাহ চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এতে ১০টি কারাকোরাম-৮ হালকা আক্রমণ বিমান, ২০০টির বেশি ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের কথা রয়েছে, যা দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।
জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব চুক্তি পাকিস্তানের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রসারে সহায়ক। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্ন হলো—পাকিস্তান কি কেবল অস্ত্র রপ্তানির মাধ্যমে লাভ তুলছে, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি ‘নিরাপত্তা প্রদানকারী রাষ্ট্র’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ভেতরের নিরাপত্তা সংকট পাকিস্তানের এই লক্ষ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক ব্যাপক সহিংসতায় শতাধিক সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হলেও প্রাণ গেছে নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদেরও। ইসলামাবাদেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবান সরকারের সঙ্গে উত্তেজনা ও সীমান্তপারের জঙ্গি তৎপরতা পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ঘরোয়া নিরাপত্তায় ব্যস্ত রাখছে। ২০২৫ সালেই এই সংঘাতে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পাকিস্তান বড় সীমাবদ্ধতায় রয়েছে। যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে, সেখানে পাকিস্তান এখনো ঋণ ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতার বাইরে বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পাকিস্তান পিছিয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদি সত্যিই অস্ত্র বিক্রেতা নয়, বরং একটি নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চায়, তাহলে তাকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা জোরদার করতে হবে এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি ও ঘটনাভিত্তিক কূটনীতিই দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে যাবে।

