spot_img

চীনে শি চিনপিংয়ের ক্ষমতা আরও সংহত, উদ্ভাবনী অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

অবশ্যই পরুন

চীনের রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছেন প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সম্মেলন ‘ফিফথ প্লেনাম’-এ দলীয় শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রশাসনের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের ওপর বেইজিংয়ের নজরদারি আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে শি চিনপিংয়ের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার এই উদ্যোগ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে উঠে আসা চীনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের এই প্রবণতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২০১২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে শি চিনপিং দল ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ক্রমাগত শক্তিশালী করেছেন। এবারের ফিফথ প্লেনামেও সেই ধারাবাহিকতার প্রতিফলন দেখা গেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইএসএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দলীয় শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং স্থানীয় নেতাদের ওপর নজরদারি জোরদারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ফিফথ প্লেনামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা স্থানীয় প্রশাসনের সর্বস্তরে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দলীয় কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য, দায়িত্ব পালনের দক্ষতা এবং নেতৃত্বের নির্দেশনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি চিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে প্রায় ৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ শাস্তির মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে ৯৬৩ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন।

সম্মেলনে দলীয় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

চীনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পরিবেশ ধরে রাখা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিকস এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে গবেষক ও উদ্যোক্তাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ প্রয়োজন। নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ঝুঁকি গ্রহণ এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু রাজনৈতিক আনুগত্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলে প্রশাসনের কর্মকর্তা, গবেষক ও উদ্যোক্তারা ভুল সিদ্ধান্তের শাস্তি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ থেকে দূরে থাকতে পারেন।

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্যোগ গ্রহণের প্রবণতা কমাতে পারে। এতে প্রকৃত কাজের পরিবর্তে আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রদর্শনের প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শি চিনপিংয়ের প্রশাসনের যুক্তি, দুর্নীতি দমন এবং দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ছাড়া রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক অনিয়ম কমবে, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়বে—এমনটাই মনে করে বেইজিং।

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ফলে স্থানীয় কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাবেন। কোনো প্রকল্প ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক দায় বহনের আশঙ্কায় তাঁরা নতুন উদ্যোগ গ্রহণ থেকেও বিরত থাকতে পারেন।

এতে চীনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা তৈরির ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

চীনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিফথ প্লেনামের গুরুত্ব আরও বেড়েছে ২০২৭ সালে অনুষ্ঠেয় কমিউনিস্ট পার্টির পরবর্তী জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী সম্মেলনে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি হতে পারে। সে কারণে বর্তমান নেতৃত্ব দলীয় আনুগত্য, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) বিশ্লেষণেও ২০২৭ সালের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রস্তুতি এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

শি চিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন একদিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও কেন্দ্রীভূত করছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিকস ও উন্নত প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতৃত্ব অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

কিন্তু এই দুই লক্ষ্য বাস্তবায়নের মধ্যে একটি জটিল ভারসাম্য রয়েছে।

কারণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, বড় গবেষণাগার কিংবা বিপুল অর্থায়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা, প্রতিযোগিতা এবং ব্যর্থতা থেকে শেখার সুযোগ।

ফলে চীনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—শি চিনপিংয়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার নীতি কি দেশটির অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে, নাকি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণই একসময় উদ্ভাবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

সর্বশেষ সংবাদ

সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (০৮ নভেম্বর) বিকেল...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ