যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ৭টি শর্ত দিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) সচিব মোহসেন রেজাই শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে শর্তগুলোর সবগুলো প্রকাশ করেননি তিনি।
আলোচনার পথ খোলার এমন ইঙ্গিত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না, তা নিয়ে ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রেজাই আলাদাভাবে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের তিনটি দাবি তুলে ধরেছেন। এগুলো হলো: সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের তৈরি করা সংকট থেকে বের হতে চাইলে ইরানের অধিকার ও শর্ত মেনে নিতে হবে।
রেজাই জানান, ইরানের এসব শর্ত, কাতার, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এখন ওয়াশিংটনের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান।
তার এই বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে, কয়েক মাসের সংঘাত ও দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পরও দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
গত জুনে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য ছিল সংঘাত বন্ধ করে বৃহত্তর একটি চুক্তির পথ তৈরি করা। তবে পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। শেষ পর্যন্ত, আগস্টে, কোনো স্থায়ী সমাধান ছাড়াই সমঝোতাটির মেয়াদ শেষ হয়।
ইরানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করা হবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালাবেন কি না, এ বিষয়ে তাকে ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী।
আগামী সপ্তাহে, নিউইয়র্কে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সংঘাতের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন ট্রাম্প।
এদিকে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির তেহরান সফরও কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই জানিয়েছেন, নকভির সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ইরান-পাকিস্তানের আগের চুক্তিগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট মার্কিন বার্তা বা প্রস্তাব নিয়ে তেহরানে যাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন বাঘেই।
তবে পাকিস্তানের চলমান মধ্যস্থতার ভূমিকার কথা স্বীকার করে বাঘাই বলেন, ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক।
আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও সামরিক বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছেন রেজাই। তিনি বলেন, আগের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের কৌশল পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন করে মার্কিন হামলার সম্ভাবনাকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে তেহরান।
রেজাইয়ের দাবি, ইরানের সামরিক পরিকল্পনার বড় অংশ এখন উপসাগর থেকে ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবস্থান করা মার্কিন নৌবাহিনীর সম্পদকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে।
সম্প্রতি একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী বা অন্য কোনো মার্কিন নৌযানের কাছে ইরান একটি জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা মোকাবিলায় ইরান আগের তুলনায় আরও ভালোভাবে প্রস্তুত বলেও মন্তব্য করেন রেজাই।
তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রেজাই সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরানের পাল্টা জবাবের আওতায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি দেশটির বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কোম্পানিগুলোও আসতে পারে।
অন্যদিকে, দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটানোই তেহরানের কৌশল বলে জানিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রেখে আলোচনার পথ খোলা রাখছে ইরান, অন্যদিকে আলোচনা ব্যর্থ হলে নতুন করে সংঘাতে যাওয়ার প্রস্তুতিও ধরে রাখছে দেশটি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি ঘোষণার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল ইরান। তবে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয় বলে জানিয়েছেন রেজাই।
তার ভাষ্য, তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে চুক্তির খসড়া এখনো প্রস্তুত রয়েছে। তবে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার আগে আঞ্চলিক দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা করে ইরান আগের সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন রেজাই।
তার দাবি, ইরানের ওই পদক্ষেপের আগে যুক্তরাষ্ট্র বান্দার আব্বাস ও একটি ইরানি নজরদারি প্ল্যাটফর্মে হামলা চালিয়েছিল।
ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি বলেও জানিয়েছেন রেজাই।
তিনি বলেন, পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে এবং দেশটির পারমাণবিক নীতিতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে ইরানের অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। বিশেষকরে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন চাপ বাড়ালে পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিতে পারে।
রেজাইয়ের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের কারণে এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি তেহরান।

