মুনাফিক শব্দটি নফক শব্দ থেকে গঠিত। নফকের অর্থ গর্ত, ছিদ্র, সুড়ঙ্গ, বের হওয়া, খরচ করা, ব্যয় করা। কারো মতে, ‘নাফেকুল ইয়ারবু’ (পাহাড়ি ইঁদুর) থেকে মুনাফিক শব্দটি গঠিত। পাহাড়ি ইঁদুরকে ‘নাফেকুল ইয়ারবু’ বলা হয়। কারণ পাহাড়ি ইঁদুর অত্যন্ত ধূর্ত হয়, এরা পাহাড়ে অনেক গর্ত খনন করে।
এদের মারার জন্য এক গর্তে পানি বা অন্য কিছু দিলে অন্য গর্ত দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে যায়, ফলে এদের সহজে মারা যায় না। মুনাফিকও অনুরূপ ধূর্ত। তাদের সহজে চেনা যায় না।
মুনাফিক হলো এমন ব্যক্তি যে ইসলামকে মুখে প্রকাশ করে এবং অন্তরে কুফরিকে লালন করে।
নিফাক ও মুনাফিকি দুই ধরনের—এক. বিশ্বাসগত মুনাফিকি, দুই. কর্মগত মুনাফিকি। বিশ্বাসগত মুনাফিকি হলো, অন্তরে কুফরি রেখে নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করা। এ ধরনের মুনাফিকির মাধ্যমে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। আর কর্মগত মুনাফি যেমন- আমানতের খিয়ানত করা, মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, গালিগালাজ করা ইত্যাদি। এসব কর্ম মুনাফিকি হলেও এসবের মাধ্যমে কেউ ইসলাম ধর্ম থেকে বের হয়ে যায় না।
আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ৮ থেকে ২০ পর্যন্ত মোট ১৩টি আয়াত মুনাফিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে নাজিল করেছেন। তা ছাড়া বিভিন্ন সুরায় আরো ৩৮টি আয়াতে মুনাফিকদের আলোচনা করেছেন।
মদিনার মুনাফিকদের শ্রেণিবিভাগ
মদিনায় মুনাফিকদের সংখ্যা প্রায় ৩৭০ জন পুরুষ ও নারী ছিল। তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, বিরোধ ও ষড়যন্ত্র সৃষ্টি করত। তবে ওহির মাধ্যমে সমর্থিত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন প্রজ্ঞা, শক্তি ও দূরদর্শিতা দান করেছিলেন, যা তাঁর আগে বা পরে কোনো নেতার মধ্যে এত ব্যাপকভাবে একত্রিত হয়নি।
তারা ছিল আহলে কিতাবের কিছু লোক, যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু অন্তরে কুফর লুকিয়ে রেখেছিল। আওস ও খাজরাজ গোত্রের কিছু লোক এবং মদিনার আশপাশের মরুচারী আরবদের একটি দল।
মদিনার যুগে ফিতনা-ফাসাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুনাফিকের নাম নিচে দেওয়া হলো—
আওস ও খাজরাজের মুনাফিকরা
আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল। তিনি ছিলেন মুনাফিকদের নেতা। তাঁর ব্যাপারে সুরা আল-মুনাফিকুন নাজিল হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া হাশরের ১১-১৭ নম্বর আয়াত, ইফকের ঘটনা সম্পর্কিত সুরা নূরের আটটি আয়াত এবং আরো অনেক আয়াতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাস ইবনু সুয়াইদ ইবনুস সামিত। তাঁর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার বাণী নাজিল হয়—‘তারা আল্লাহর নামে শপথ করে যে তারা কিছু বলেনি; অথচ তারা অবশ্যই কুফরির কথা বলেছে।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত : ৭৪)
হারিস ইবনু সুয়াইদ। তাঁর ব্যাপারে এই আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে—‘আল্লাহ কিভাবে এমন জাতিকে হেদায়াত করবেন, যারা ঈমান আনার পর কুফরি করেছে এবং সাক্ষ্য দিয়েছিল যে রাসুল সত্য…।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৬)
বিজাদ ইবনু উসমান ইবনু আমির ও নাবতাল ইবনুল হারিস। তাঁর ব্যাপারে এই আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে—‘তাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয় এবং বলে, ‘তিনি তো সব কথা শোনেন। বলুন, তিনি তোমাদের কল্যাণের কথাই শোনেন…।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত : ৬১)
জুওয়াই ইবনুল হারিস, তিনি আওসি ছিলেন।
আবু হাবিবা ইবনুল আজআর । তিনি মসজিদে দিরার নির্মাণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল—খিজাম ইবনু খালিদ, আব্বাদ ইবনু হুনাইফ, আমর ইবনু খিজাম, জারিয়া ইবনু আমির, তাঁর দুই ছেলে মুজাম্মি ও জায়েদ এবং ওয়াদিয়া ইবনু সাবিত।
তাঁদের প্রসঙ্গে সুরা আত-তাওবার ১০৭ নম্বর আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে—‘আর যারা ক্ষতিসাধন, কুফরি, মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং আগে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী ব্যক্তির জন্য ঘাঁটি হিসেবে একটি মসজিদ গ্রহণ করেছে…।’
আওস ইবনু কায়জি। তাঁর ব্যাপারে সুরা আল-আহজাবের ১৩ নম্বর আয়াত নাজিল করা হয়েছে। তিনি মিরবাআ ইবনু কায়জির ভাই ছিলেন; মিরবাআকেও মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়।
আবু তুমা বশির ইবনু উবাইরিক। দুইটি বর্ম চুরির ঘটনার সঙ্গে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ব্যাপারে সুরা আন-নিসার ১০৭ নম্বর আয়াত উল্লেখ করা হয়, আর যারা নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত করে, তুমি তাদের পক্ষে বিতর্ক করো না।
কায়স ইবনু আমর ইবনু সাহল, আমর ইবনু কায়স, যায়েদ ইবনু আমর এবং রাফি ইবনু ওয়াদিয়া—তাঁরা সবাই খাজরাজের বনু নাজ্জার গোত্রের ছিলেন।
জাদ্দ ইবনু কায়স। তাঁর ব্যাপারে সুরা আত-তাওবার ৪৯ নম্বর আয়াত নাজিল হয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ বলে, ‘আমাকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে পরীক্ষায় ফেলবেন না।’
ইহুদি ধর্মীয় নেতাদের মধ্যকার মুনাফিকরা
এদের মধ্যে আছে—সাদ ইবনু হুনাইফ, জায়েদ ইবনুল লাসিত, নুমান ইবনু আওফা ইবনু আমর, উসমান ইবনু আওফা—এরা সবাই বনু কায়নুকা গোত্রের বলে জানা যায়।
এছাড়া, রাফি ইবনু হুরাইমিলা—মুনাফিকদের অন্যতম বড় নেতা হিসেবে উল্লেখিত। রিফাআ ইবনু জায়েদ ইবনুত তাবুত, সিলসিলা ইবনু বারহাম, কিনানা ইবনু সুরাইয়া।
অন্যান্য মুনাফিক
আসমা বিনতে মারওয়ান, আখনাস ইবনু শারিক আস-সাকাফি—তিনি সাকিফ গোত্রের ছিলেন। তাঁর বাহ্যিক অবয়ব আকর্ষণীয় এবং কথাবার্তা ছিল মিষ্টি। তাঁর ব্যাপারে সুরা আল-বাকারার ২০৪ নম্বর আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের মধ্যে এমন কেউ আছে, যার পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে এবং সে তার অন্তরের বিষয়ে আল্লাহকে সাক্ষী করে; অথচ সে সবচেয়ে কঠিন বিরোধী।
এগুলো মদিনায় মুনাফিকদের কর্মকাণ্ড ও ফিতনা-ফ্যাসাদে ভূমিকা রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নাম।

