ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে, গাজা উপত্যকায় পরিবারের ঘনিষ্ঠ ৭৫ জনের বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন নিহত হামাস রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান ইসমাইল হানিয়ার ছেলে আবদুল সালাম হানিয়া। একইসঙ্গে, বৃহত্তর আল-হাজ্জ গোত্রের প্রায় ২৫০ সদস্য নিহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বাবার হত্যার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবদুল সালাম এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি তুরস্কের রাজনৈতিক সমর্থনের প্রশংসা করেন এবং গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতা সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বাড়ির দেয়ালে ঝোলানো একটি বড় পারিবারিক ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল সালাম যুদ্ধের নিহত স্বজনদের দেখান। তিনি বলেন, ছবিতে থাকা অনেকেই ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল, পবিত্র রমজান শেষে, মুসলিমদের অন্যতম প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতরের প্রথম দিনে ইসরায়েলি হামলায় ইসমাইল হানিয়ার তিন ছেলে: মোহাম্মদ, হাজেম ও আমির এবং তার কয়েকজন নাতি নিহত হন।
বাবা ইসমাইল হানিয়াকে একজন অভিভাবক, শিক্ষক, নেতা ও বন্ধুর সমন্বিত রূপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন আবদুল সালাম।
তিনি বলেন, ‘বাড়িতে আমার বাবা ছিলেন শিক্ষক, পরামর্শদাতা, নেতা, স্নেহশীল বাবা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু।’
তার দাবি, ইসমাইল হানিয়া সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতেন, তাদের মতামত জানতে চাইতেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন।
বাবাকে স্মরণ করে আবদুল সালাম বলেন, ‘আমরা তার সুন্দর কণ্ঠ, উষ্ণ উপস্থিতি, তার সঙ্গে কাটানো সময় এবং বাড়িতে একসঙ্গে কোরআন তেলাওয়াতের আসরগুলোকে খুব মনে করি।’
ইসমাইল হানিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া, এমনটাই জানিয়েছেন তার ছেলে।
আবদুল সালাম বলেন, ‘তিনি সবসময় আমাদের মানুষের মধ্যে থাকতে, মানুষের জন্য কাজ করতে এবং পরিবার, প্রতিবেশী ও মসজিদের কাছাকাছি থাকতে বলতেন। কারণ মানুষের কল্যাণই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।’
তিনি জানান, বাবা সন্তানদের বিনয়ী থাকতে, পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখতে, সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়াতে, নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াত অব্যাহত রাখতে এবং মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।
ইসমাইল হানিয়া হত্যার দুই বছর পরও ফিলিস্তিনি জনগণের জীবনে তার প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন আবদুল সালাম।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণমাধ্যমে তার বাবাকে স্মরণ করা হচ্ছে এবং তার উত্তরাধিকার ফিলিস্তিনি আন্দোলনের অংশ হয়ে আছে।
ইসমাইল হানিয়া, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই, ইরানের রাজধানী তেহরানে নিহত হন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ওই হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলের দায় স্বীকার করেন।
সাক্ষাৎকারে তুরস্কের ভূমিকার প্রশংসা করে আবদুল সালাম হানিয়া বলেন, দেশটি হাজারো ফিলিস্তিনিকে আশ্রয় দিয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থানের প্রশংসা করেন।
আবদুল সালাম বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলের অবসান ও একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে।’
তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, সাধারণ পরিষদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগে তুরস্কের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।
এছাড়াও ফিলিস্তিনের প্রতি আন্তর্জাতিক জনসমর্থন এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছেন আবদুল সালাম। তবে এই জনসমর্থনকে কার্যকর রাজনৈতিক পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার ভাষায়, ‘জনগণের বার্তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পৌঁছাতে হবে, যাতে সংঘাতের অবসান হয়, দখলদারিত্ব শেষ হয় এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।’
তিনি গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
একইসঙ্গে, গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতা সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আবদুল সালাম হানিয়া।
তিনি বলেন, ‘আমরা মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতার মধ্যে রয়েছি। আশা করছি, শিগগিরই চুক্তির বাস্তবায়ন হবে এবং ইসরায়েল তা মেনে চলবে।’
তিনি বলেন, এই চুক্তি গাজায় পুনর্গঠন, স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহারের পথ তৈরি করবে।
গাজার মানুষের উদ্দেশে আবদুল সালাম বলেন, ‘আমরা তোমাদেরই অংশ, আর তোমরাও আমাদের অংশ।’
তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে গাজার শিশুরা বিশ্ববাসীর কাছে সহিংসতা বন্ধের আবেদন জানাচ্ছে। তার দাবি, এই যুদ্ধে ৩০ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গাজা ও ফিলিস্তিনের শিশুরা বিশ্বের অন্য শিশুদের মতো বাঁচার অধিকার রাখে। তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার, শিক্ষা পাওয়ার এবং আশা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।’
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এরপর থেকে ১ হাজার ২২২ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ৩৪৯ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ১৬২ জন।

