বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা প্রণয়নে বিদ্যমান শূন্যতা পূরণে চীনের নেতৃত্ব নেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছে দেশটির একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা কেবল উন্নতএআই প্রযুক্তি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানদণ্ড নির্ধারণের সক্ষমতাই হবে প্রকৃত শক্তির পরিচয়।
এই আলোচনা নতুন করে সামনে আসে বেইজিংভিত্তিক স্টার্টআপ মুনশট এআই চলতি মাসে তাদের ওপেন-ওয়েটএআই মডেল কিমি কে৩ উন্মুক্ত করার পর। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, মডেলটি সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয়এআই মডেলগুলোর কাছাকাছি হলেও এর উন্নয়ন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। মডেলটির মূল উপাদান উন্মুক্ত করে দেওয়ায় বিশ্বের যে কেউ এটি বিনা মূল্যে ডাউনলোড, পরীক্ষা ও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারছে।
এআই শাসনব্যবস্থা এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি অভিযোগ করেন, চীনেরএআই কোম্পানিগুলো মার্কিন প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্বের অপব্যবহার করছে। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে, চীনের ওপেন-ওয়েটএআই মডেল ব্যবহারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের অনেক উদ্যোক্তা ওএআই স্টার্টআপ। তাদের মতে, ওপেন-ওয়েট মডেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা উদ্ভাবন ও গবেষণার গতি কমিয়ে দিতে পারে।
এদিকে সাংহাইভিত্তিক ঝাংজিয়াং প্ল্যাটফর্ম ইকোনমি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলেছে, দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হবেএআই-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরির ক্ষমতা নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমানেএআই মডেল ডিস্টিলেশন,এআই-উৎপাদিত কনটেন্টের মালিকানা এবংএআই সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎস শনাক্তকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো কোনো গ্রহণযোগ্য বৈশ্বিক নীতিমালা নেই।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, যে দেশ সবার আগে অধিকাংশ রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন নিয়ম ও মানদণ্ড প্রস্তাব করতে পারবে, ভবিষ্যতেরএআই শাসনব্যবস্থায় সেই দেশই নেতৃত্ব দেবে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও সুপারিশ করেছে,এআই মডেলের উৎস এবং প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ডেটা শনাক্ত করার প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। একই সঙ্গে ওপেন-ওয়েটএআই মডেল উন্নয়ন, ওপেন-সোর্স পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং কাঠামো তৈরিতেও চীনের সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি-সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেল ইউইয়ুয়ান তানথিয়ান-ও একই ধরনের মত প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে মূল প্রশ্ন আর ওপেন-সোর্স নাকি ক্লোজডএআই নয়; বরংএআই-এর নিরাপত্তা, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ পরিচালনার নিয়ম কে নির্ধারণ করবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
চ্যানেলটি এমন একটি নীতির পক্ষে মত দিয়েছে, যেখানে মৌলিকএআই সক্ষমতা উন্মুক্ত থাকবে, তবে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ও অত্যাধুনিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
এদিকে ১৭ জুলাই সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্স (ডব্লিওএআইসি)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, এআই খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে এবং একটি “ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক” বৈশ্বিকএআই শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীন কাজ করে যাবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই উন্নয়নে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এখন আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও মানদণ্ড নির্ধারণও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। চীনের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
সূত্র: সাউথ চায়না মনিং পোস্ট

