ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি রোববার দেশটির বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, গত বছর থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কথিত আগ্রাসী যুদ্ধের সময় ইরানি জনগণের যে অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তার বিচার নিশ্চিত করতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে।
বিচার বিভাগ সপ্তাহ এবং আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ বেহেশতি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের নিহত হওয়ার বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় খামেনি বলেন, “২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো দুটি আগ্রাসী যুদ্ধে নিহতদের রক্ত, সেই সঙ্গে দেশের ভেতরে ও বাইরে ইরানি জনগণের ওপর শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও নৈতিক ক্ষয়ক্ষতি—এসব শত শত, এমনকি হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ আইনি মামলার ভিত্তি হতে পারে।”
খামেনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব মামলার কার্যকর অনুসরণ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো “আন্তর্জাতিক অপরাধী” ও “অহংকারী ও আগ্রাসী শক্তিগুলোর” কারণে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ইরানি জনগণের অধিকার রক্ষা শুধু ব্যক্তিগত আইনি বিষয় নয়; বিদেশি শক্তির অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সামষ্টিক অধিকার রক্ষাও এর অন্তর্ভুক্ত।
খামেনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, জনস্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইন বাস্তবায়ন করা। এসব দায়িত্ব সফলভাবে পালন করা গেলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা, উত্তেজনা বৃদ্ধির হুমকি
রোববার ভোরে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর কিছুক্ষণ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তি মানা না হলে ইরানের নেতৃত্বকে “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করা হবে।
এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীও জানায়, তারা আবার ইরানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে, যা সংঘাত চলাকালে অনেকাংশে বন্ধ ছিল।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “এমন সময় আসতে পারে যখন আমাদের আর সংযত থাকা সম্ভব হবে না এবং আমরা যে কাজ অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করেছি, তা সামরিকভাবে শেষ করতে বাধ্য হব।”
তিনি আরও বলেন, “যদি তা ঘটে, তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আর অস্তিত্ব থাকবে না।”
১৪ দফার অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
শান্তি চুক্তির পরও সহিংসতা
এক সপ্তাহ আগে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের মধ্যস্থতায় আলোচনা হয়। ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করে। তবে এরপর থেকে সংঘর্ষ আবারও শুরু হয় এবং আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ট্রাম্পের বার্তার প্রায় এক ঘণ্টা পর কুয়েত জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। বাহরাইনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তাদের নৌ ও বিমান বাহিনী কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এবং এর ফলে “সব ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।”
একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, হামলায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি, যদিও পরিস্থিতি তখনও পরিবর্তনশীল ছিল।
পরে বাহরাইনে আবারও সাইরেন বাজে। কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি ইরানি হামলায় মুহাররাক প্রদেশের একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে কেউ হতাহত হয়নি। বাহরাইন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানায়।
কুয়েত জানায়, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
কাতারের নিন্দা
কাতার ইরানের কুয়েত ও বাহরাইনে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি এসব হামলাকে দুই দেশের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর অবমাননা বলে উল্লেখ করেছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সংলাপ ও কূটনীতির পথ অনুসরণ, উত্তেজনা কমানো এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কাতার বাহরাইন ও কুয়েতের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে।
ইরাক: হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে হবে
ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন তাঁর ইরানি সমকক্ষ আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকে বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ইরাক উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুদ্ধের বিস্তার চায় না এবং ইরানের ওপর হামলারও সমর্থন করে না।
আরাঘচি: যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধে চাপ দিক
বাগদাদে সফরকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের সব ধারা বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, সমঝোতা গ্রহণের পরও ইসরায়েল লেবাননে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রকে “নিজেদের দায়িত্ব পালন” করে ইসরায়েলকে হামলা বন্ধে বাধ্য করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি লেবাননের দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবিও জানান।
হরমুজ প্রণালি ৩০ দিন ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে
আরাঘচি বলেন, আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি ইরানের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায় থাকবে।
তিনি বলেন, “সব বাধা দূর হওয়ার পর জলপথটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হবে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, এই জলপথের দায়িত্ব একমাত্র ইরানের এবং অন্য কোনো পক্ষের একতরফা হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে।
ইরাককে ধন্যবাদ
আরাঘচি সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরাক সরকার ও জনগণের সমর্থনের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ইরাকি জনগণ সবসময় “তাদের ইরানি ভাইদের” পাশে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে ইরানের অভিযোগ
ইরান দাবি করেছে, রোববার যুক্তরাষ্ট্র তাদের দক্ষিণ উপকূলের কয়েকটি নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। তেহরান বলেছে, এটি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই নির্মম হামলা প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অঙ্গীকারের প্রতি ন্যূনতম মূল্যও দেয় না এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা তাদের স্বভাবের অংশ।”
ইসরায়েলের দাবি
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় রকেটচালিত গ্রেনেডধারী হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের হত্যা করেছে এবং একটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করেছে, যা তাদের সেনাদের জন্য হুমকি ছিল।
কুয়েতের নিন্দা
কুয়েত ইরানের সর্বশেষ হামলাসহ বারবার তাদের ভূখণ্ডে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, এসব হামলা তাদের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং দেশটির নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন

