যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের খার্গ দ্বীপে অন্তত ২৫টি হরিণ মারা গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির পরিবেশ কর্মকর্তারা। তবে তাদের ধারণা, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
ইরানের গুরুত্বপূর্ণ হরিণ আবাসস্থলগুলোর একটি খার্গ দ্বীপ। সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে বন্যপ্রাণীর ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে, এই ঘটনাকে তার অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা দপ্তরের উপপরিচালক মাসুমেহ সাফায়ি জানান, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দ্বীপটিতে অন্তত ২৫টি হরিণের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই হিসাব শুধুমাত্র সামরিক এলাকার বাইরের অংশের জন্য প্রযোজ্য। ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, যুদ্ধের প্রভাব শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিস্ফোরণ, আবাসস্থল ধ্বংস এবং দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র শব্দের মধ্যে থাকার কারণে প্রাণীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে।
সাফায়ি জানান, বিস্ফোরণের কারণে সৃষ্ট তীব্র মানসিক চাপ বন্দী প্রাণীদেরও প্রভাবিত করেছে। তেহরানের লাভিজান বার্ড গার্ডেনে ভয় ও আতঙ্কে কিছু পাখি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাঁচার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আহত ও নিহত হয়েছে।
তিনি বলেন, বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে অনেক পাখি চরম ভীতি ও মানসিক চাপে পড়ে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে আলবোরজ প্রদেশের একটি বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকেও প্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণ এবং সীমিত সংখ্যক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
যদিও এখন পর্যন্ত বুনো ছাগল, বুনো ভেড়া বা বড় মাংসাশী প্রাণীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি, তবু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে রিপোর্ট না থাকা মানেই ক্ষতি হয়নি—এমন নয়। যুদ্ধের সময় অনেক প্রাণী দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়, ফলে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোকামাকড়, ইঁদুর, সরীসৃপ এবং মাটির নিচে বা কাছাকাছি বসবাসকারী ছোট প্রাণীগুলো বিস্ফোরণের অভিঘাত ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
পরিবেশ গবেষক শিভা রুস্তাই বলেন, যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রাণহানির চেয়েও বেশি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তার ভাষায়, বিস্ফোরণ ও তীব্র শব্দদূষণের কারণে প্রাণীদের শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং রোগ সংক্রমণ, প্রজননক্ষমতা হ্রাস এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বন্যপ্রাণীদের অভিবাসন পথ, খাদ্য সংগ্রহের অভ্যাস এবং প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কিছু প্রজাতির মধ্যে গর্ভপাতের হার বেড়ে যায়, আবার অনেক প্রাণীর মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ বা বিষণ্নতার লক্ষণও দেখা দেয়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যপ্রাণী একটি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সংঘাত-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে প্রাণহানির নথিভুক্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণী জনগোষ্ঠীর পর্যবেক্ষণ এবং আবাসস্থল পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
সূত্র: প্রেস টিভি

