বাংলাদেশের বিনোদন জগতে জেন্ডার সংবেদনশীল ও ইতিবাচক চিত্রনাট্য তুলে ধরার লক্ষ্যে গতকাল শনিবার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো দিনব্যাপী এক বিশেষ কর্মশালা।
‘জেন্ডার সংবেদনশীল চিত্রনাট্য রচনা বিষয়ক কর্মশালা’ শীর্ষক এই আয়োজনে দেশের প্রায় ৬০ জন স্বনামধন্য চিত্রনাট্যকার অংশ নেন।
সমাজ পরিবর্তনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংবেদনশীল গল্প বলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে চিত্রনাট্যকারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সচেতন করা হয় এই আয়োজনে।
‘সমতায় তারুণ্য: ইয়ুথ ফর ইকুয়ালিটি’ প্রকল্পের আওতায় ও টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের সহযোগিতায় রাজধানীর এক পাঁচতারকা হোটেলে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে চার বছর মেয়াদী এই প্রকল্প যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট।
সংঘের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন উজ্জ্বল তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, “নাটকে নারীকে যে বৈষম্য ও অবহেলার পাত্র হিসেবে দেখানো হয়, সেখান থেকে তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার রূপে নিয়ে আসতে হবে আমাদের। তাহলেই আমাদের চিন্তাগুলো প্রভাবিত হবে। অভিজ্ঞ ও তরুণ নাট্যকারদের এই বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।”
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন ও কমিউনিকেশনস বিভাগের পরিচালক ” নিশাত সুলতানা বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ যুবনারী ও শিশুদের ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিনোদন, বিশেষ করে নাটক ও চলচ্চিত্রের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, তাই সহিংসতা কমানো ও সমতা প্রতিষ্ঠায় এসব মাধ্যমে জেন্ডার-সংবেদনশীল চিত্রনাট্য অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিবর্তন আনতে চিত্রনাট্যকারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ‘কর্মশালায় বক্তারা বিনোদন মাধ্যমে, বিশেষ করে টেলিভিশন ও অনলাইন নাটকে বিদ্যমান জেন্ডার বৈষম্য ও সমাজে প্রচলিত জেন্ডার বিষয়ক নেতিবাচক ধারণাগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। চিত্রনাট্যে নারী ও পুরুষের সমতা এনে সংবেদশীল বিনোদন মাধ্যম গড়ার লক্ষ্যে নাট্যকারদের মাঝে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয় এই কর্মশালায়।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পের কনসোর্টিয়াম ও অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার মো. হুসাইন শাকির বলেন, “আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে যুবরা সহিংসতামুক্ত পরিবেশে নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারবে।”
তিনি আরও বলেন, “এ ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যকাররা সমাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের প্রতিটি গল্প সমাজের মানুষের চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রভাবিত করে। আমরা একসাথে কাজ করলে প্রচলিত বৈষম্যগুলোকে দূর করে একটি সমতাপূর্ণ সমাজ গড়া সম্ভব।”
দিনব্যাপী এই কর্মশালা পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিশিষ্ট নাট্যকার ও পরিচালক মাসুম রেজা এবং প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও শিক্ষাবিদ ওয়াহিদা মল্লিক জলি। আলোচনায় সামাজিক ধারণা গঠনে মিডিয়ার ভূমিকা, চরিত্রায়নে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং চিত্রনাট্যে জেন্ডার সংবেদনশীল ভাষার প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে আসে।
কর্মশালায় নাট্যকার মাসুম রেজা প্রশ্ন রাখেন, “আপনি নারীকে কোন ভূমিকায় দেখতে চান? প্রচলিত বা প্রথাগত কোনো ছককাটা চরিত্রে, নাকি সেই যৌক্তিক ভূমিকায় যা সত্যিকার অর্থেই একজন নারীর প্রাপ্য? নারীর চিত্রায়নের ক্ষেত্রে আমাদের চিরাচরিত প্রথা থেকে বের হয়ে এসে নারীকে ক্ষমতায়নের” ভূমিকায় দেখাতে হবে।
টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের সহ সভাপতি মেজবাউদ্দীন সুমন বলেন, “আজকের আয়োজনটি কেবল একটি কর্মশালা নয়; এটি একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। নাটকে আমাদের ব্যবহার করা ভাষা এবং যে চিন্তাগুলোর প্রচার ও প্রসার আমরা সচরাচর করে থাকি, সেগুলোকে প্রশ্ন করার এবং সঠিক প্রয়োগ বোঝার মঞ্চ এটি।”
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মূলধারার গণমাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক গল্পের চর্চা বাড়বে এবং জেন্ডার সমতা বিষয়ে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন অংশগ্রহণকারীরা।

