ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে চালানো হামলায় ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং এতে ইসরায়েল আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এমনকি ‘ইরান আর আগের সেই ইরান নেই’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে এই বক্তব্যের মাধ্যমে যুদ্ধের বয়ানকে ইসরায়েলের পক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তিনি। খবর আল জাজিরা
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের ওপর প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চালানো হামলায় দেশটির শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা নিহত হয়েছেন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও বাসিজ বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ইরান আর আগের সেই ইরান নেই’। তার দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হামলার ফলে ইরান তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক কর্মসূচি ভূগর্ভে সরিয়ে নেয়ার সুযোগ পায়নি।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এবং হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম সম্পর্কে জানতে চাইলে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি তাদের কারও জন্য ‘জীবন বীমা’ নেবেন না, অর্থাৎ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা দিচ্ছেন না।
তিনি আরও বলেন, খামেনি হলেন ‘রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি পুতুল’ এবং তিনি প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। উল্লেখ্য, সম্প্রতি খামেনির একটি বক্তব্য ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংবাদ উপস্থাপক পড়ে শোনান।
ইরানে সরকারের বিরুদ্ধে যারা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন, তাদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা আপনাদের পাশে আছি’। তবে তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আপনাদেরই নিতে হবে, বিষয়টি আপনাদের হাতেই।’
তার এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মন্তব্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ট্রাম্পও বারবার ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে এই অঞ্চলে নতুন জোট গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে এটি সম্ভব ছিল না, কিন্তু এখন আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
অন্যদিকে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যার ফলে কয়েকটি তেল টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে ইরান বলেছে, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলো বলছে, এসব হামলা ভবিষ্যতের জন্য পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)–সমর্থিত একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। ওই প্রস্তাবে উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে তেহরানকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিল। তবে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্ক আবারও তিক্ত হয়ে ওঠে।
রামাল্লাহ থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নূর ওদেহ বলেন, নেতানিয়াহুর এই সংবাদ সম্মেলন ছিল যুদ্ধকে ইসরায়েলের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা। তিনি বলেন, এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু জনপ্রিয়তা বাড়াতে চাইছেন। তবে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, তিনি একটি আসন হারাতে পারেন।
ওদেহ আরও বলেন, ইসরায়েলে আসা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশে সামরিক সেন্সরশিপ থাকায় বাস্তব পরিস্থিতির অনেক তথ্য প্রকাশ পায় না। ফলে যারা সরাসরি ধ্বংসযজ্ঞ দেখছেন, তাদের মধ্যে সংবাদ যেভাবে প্রকাশ হচ্ছে তা নিয়ে হতাশা রয়েছে।

