যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় দখল’ ‘‘friendly takeover” বিবেচনা করতে পারে—এমন মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তিনি দাবি করেন, কিউবার শাসকরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক বহু দশক ধরেই টানাপোড়েনপূর্ণ। ১৯৫৯ সালের কিউবার বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নানা সময়ে বিচ্ছিন্ন ও সীমিত ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার ইস্যু এবং আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অনেকে কূটনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক এবং বিতর্কিত বলে মনে করছেন। ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় দখল’ শব্দবন্ধটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করায় এটি আসলে রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নাকি সরাসরি হস্তক্ষেপ—তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে হাভানার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
হোয়াইট হাউসের লনে টেক্সাস যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্টশিয়াল হেলিকপ্টার ‘মেরিন ওয়ান’-এ ওঠার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় শুক্রবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে এই ইঙ্গিত দেন। মূলত এসময় সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে তিনি ইরান ও কিউবার মতো দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন। এই দুই দেশেই নতুন সরকার দেখতে চান বলে এর আগে জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।
কিউবার ক্ষেত্রে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিউবা সরকার আমাদের সঙ্গে কথা বলছে এবং আপনারা জানেন যে, তারা অনেক বড় বিপদে আছে। তাদের কাছে কোনও অর্থ নেই। এই মুহূর্তে তাদের কিছুই নেই, তবে তারা আমাদের সাথে কথা বলছে।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘হয়তো আমরা কিউবার একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দখল দেখতে পাব।
শেষ পর্যন্ত আমরা খুব ভালোভাবেই কিউবাকে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে দখল করে নিতে পারি।’
গত দুই মাস ধরে ট্রাম্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই কমিউনিস্ট শাসিত ক্যারিবীয় দ্বীপটিতে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুক্রবারের বক্তব্যে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন যে, কিউবা একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ যা পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি জানান, কিউবান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে মাত্র ১৪৫ কিলোমিটার (৯০ মাইল) দূরে অবস্থিত কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই বৈরী। ১৯৬০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপটির ওপর পূর্ণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, যা এর অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তবে গত ৩ জানুয়ারি থেকে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে, যখন ট্রাম্প কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ ও বন্দি করার জন্য একটি সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন।
সেই অভিযানে ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি আনুমানিক ৩২ জন কিউবান সৈন্য নিহত হয়।
এর পরপরই ট্রাম্প কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেন এবং প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিতে শুরু করেন যে, সেখানকার সরকার ‘পতনের দ্বারপ্রান্তে আছে’। গত ১১ জানুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলা থেকে আর কোনও তেল বা অর্থ কিউবায় যাবে না। এরপর ২৯ জানুয়ারি এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তিনি হুমকি দেন, যেসব দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কিউবাকে তেল সরবরাহ করবে, তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে।
জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, কিউবার বিদ্যুৎ গ্রিড মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এবং জ্বালানি সরবরাহ পুনরুদ্ধার না হলে সেখানে একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের ইচ্ছাকে গোপন রাখেনি। ২০২৫ সালের অভিষেক ভাষণে ট্রাম্প অঙ্গীকার করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘আবারও নিজেকে একটি বর্ধিষ্ণু জাতি হিসেবে বিবেচনা করবে’, যার মধ্যে ভূখণ্ড সম্প্রসারণও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সুত্র: দ্য গার্ডিয়ান

