spot_img

ঝেড়ে ফেললে কমে না, রাগ কমানোর উপায় নিয়ে কী বলছে গবেষণা

অবশ্যই পরুন

রাগ হলে তা ঝেড়ে ফেললেই মন হালকা হয়; এমন বিশ্বাস অনেকের। তবে ১৫৪টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাগ প্রকাশ তথা ‘ভেন্টিং’ করলে তা কমে না; বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শরীর-মনকে শান্ত করার কৌশল, যেমন ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস বা সাময়িক বিরতি নেয়া।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংক্রান্ত শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্ম সায়েন্স অ্যালার্ট বলছে, ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক মেটা-অ্যানালাইসিসে ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা রাগ নিয়ে করা ১৫৪টি গবেষণা বিশ্লেষণ করেন। মোট ১০ হাজার ১৮৯ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত এসব গবেষণায় বয়স, লিঙ্গ, সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্য ছিল। ফলাফলে দেখা যায়, রাগ ঝেড়ে ফেললে উপকারের প্রমাণ খুবই কম; কিছু ক্ষেত্রে এতে রাগ আরও বেড়েছে।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও যোগাযোগবিজ্ঞানী ব্র্যাড বুশম্যান ফল প্রকাশের সময় বলেন, ‘রাগ হলে তা বের করে দিতে হবে— এই ধারণাটি ভাঙা খুব জরুরি। রাগ ঝেড়ে ফেলা ভালো শোনালেও ক্যাথারসিস তত্ত্বকে সমর্থন করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ একেবারেই নেই।’

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাগ উপেক্ষা করতে হবে। কেন আমরা রাগান্বিত হই, তা ভেবে দেখা এবং অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি আবেগকে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রেও সহায়ক। আর এটি সুস্থভাবে আবেগ প্রক্রিয়াজাত করার প্রথম ধাপ। কিন্তু ভেন্টিং বা রাগ প্রকাশ করা অনেক সময় ভাবনা-পর্যালোচনার সীমা ছাড়িয়ে বারবার একই বিষয় নিয়ে ঘুরপাক খাওয়ার দিকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকেই শারীরিক কায়দার মাধ্যমে রাগ ঝাড়তে চান। এতে স্বাস্থ্যের উপকার হতে পারে, কিন্তু সেই মুহূর্তে মেজাজ হালকা নাও হতে পারে।

গবেষকদের মতে, রাগ কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো শারীরিক উত্তেজনা বা ‘অ্যারাউজাল’ কমানো, আর সেটি রাগ থেকেই হোক বা রাগের বশে করা শারীরিক কর্মকাণ্ড থেকেই হোক। বুশম্যান বলেন, ‘রাগ কমাতে এমন কাজ করা উচিত যা উত্তেজনার মাত্রা কমায়। জনপ্রিয় ধারণা যা-ই বলুক, দৌড়াতে যাওয়া কার্যকর কৌশল নয়; কারণ এতে উত্তেজনা বাড়ে এবং উল্টো ফল হতে পারে।’

এই গবেষণার পেছনে আংশিক প্রেরণা ছিল ‘রেজ রুম’-এর জনপ্রিয়তা। সেখানে মূলত মানুষ অর্থ দিয়ে জিনিসপত্র ভাঙচুর করে রাগ ঝাড়ার চেষ্টা করে। ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির যোগাযোগবিজ্ঞানী ও গবেষণার প্রধান লেখক সোফি কেয়ারভিক বলেন, ‘রাগ প্রকাশ করাই মোকাবিলার উপায়— এই তত্ত্বটি খণ্ডন করতে চেয়েছিলাম। আমরা দেখাতে চেয়েছি, শারীরবৃত্তীয় উত্তেজনা কমানোই আসলে গুরুত্বপূর্ণ।’

গবেষণাটি শাখটার-সিঙ্গার দুই-উপাদান তত্ত্বের ভিত্তিতে সাজানো হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, রাগসহ সব আবেগেরই দুটি অংশ আছে। আর তা হচ্ছে— একটি শারীরবৃত্তীয়, অন্যটি মানসিক বা জ্ঞানগত।

কেরভিক ও বুশম্যান জানান, আগের গবেষণাগুলো মূলত মানসিক দিকটিতে জোর দিয়েছে, যেমন কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির মাধ্যমে রাগের পেছনের মানসিক ব্যাখ্যা বদলানো। এতে উপকার মিললেও সবার ক্ষেত্রে এটি সমান কার্যকর নয়। নতুন এই পর্যালোচনায় রাগ কমানোর বিকল্প পথ হিসেবে শারীরবৃত্তীয় উত্তেজনা কমানোর দিকটি গুরুত্ব পেয়েছে।

গবেষণায় বক্সিং, সাইক্লিং, জগিংয়ের মতো উত্তেজনা বাড়ানো কার্যক্রমের পাশাপাশি গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, ধ্যান, যোগব্যায়ামের মতো শান্তিমূলক পদ্ধতিও বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, ল্যাব ও বাস্তব পরিবেশ, উভয় ক্ষেত্রেই শান্তিমূলক কর্মকাণ্ড রাগ কমাতে কার্যকর। ধীরগতির যোগব্যায়াম, মাইন্ডফুলনেস, প্রগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন, ডায়াফ্রাম্যাটিক ব্রিদিং এবং কিছু সময় বিরতি নেয়া, এসব পদ্ধতি ইতিবাচক ফল দিয়েছে।

কেরভিক বলেন, ‘প্রগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন বা সাধারণ রিলাক্সেশন পদ্ধতি মাইন্ডফুলনেস ও মেডিটেশনের মতোই কার্যকর, এটি বেশ আগ্রহজনক’। তার মতে, যোগব্যায়াম ধ্যানের তুলনায় কিছুটা বেশি উত্তেজনামূলক হলেও শ্বাসে মনোযোগ দেয়ার মাধ্যমে এটি রাগ কমাতে সহায়ক।

গবেষকেরা বলছেন, রাগ ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা না করে বরং সেটিকে ‘ঠান্ডা’ করে দেয়া উচিত। মানসিক চাপ কমাতে যেসব কৌশল কার্যকর, সেগুলো রাগের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কাজ করতে পারে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ উত্তেজনাবর্ধক কর্মকাণ্ড রাগ কমায়নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে বাড়িয়েছে, বিশেষ করে জগিংয়ে এমন প্রবণতা বেশি। তবে খেলাধুলাভিত্তিক বল গেম বা আনন্দময় শারীরিক কার্যক্রম শারীরিক উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। মূলত আনন্দ থাকলে শারীরিক পরিশ্রম রাগ কমাতে বেশি কার্যকর হতে পারে বলে এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বুশম্যান বলেন, ‘কিছু শারীরিক কার্যক্রম হৃদযন্ত্রের জন্য ভালো হতে পারে, কিন্তু রাগ কমানোর জন্য সেগুলো সেরা উপায় নয়। রাগ হলে মানুষ ভেন্ট বা রাগ প্রকাশ করতে চায়, কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে- ভেন্টিং থেকে যে সাময়িক ভালো লাগা আসে, তা আসলে আগ্রাসনকেই শক্তিশালী করে।’

গবেষকেরা বলছেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে আপাতত রাগ নিয়ন্ত্রণে শান্তিমূলক কৌশল, এমনকি সামান্য বিরতি নেয়া বা ১০ পর্যন্ত গোনার মতো কাজ সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে।

কেরভিকের ভাষায়, ‘রাগ সামলাতে সবারই কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপিস্টের কাছে যেতে হবে এমন নয়। ফোনে বিনা মূল্যের অ্যাপ ব্যবহার করা বা ইউটিউব ভিডিও দেখেও দিকনির্দেশনা নেয়া যায়।’

সর্বশেষ সংবাদ

‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ লড়াই করবে ভারত-ইসরায়েল

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ভারত ও ইসরায়েল ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করেছে। কৌশলগত সম্পর্ক আরও...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ