spot_img

আত্মার পুনর্জাগরণের মাস রমজান

অবশ্যই পরুন

আবার এসেছে রমজান। সময়ের প্রবাহে বছর ঘুরে এই মাসটি আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে, কিন্তু এর আগমন কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি মানুষের অন্তর্জগতে এক গভীর আহ্বান। রমজান যেন আকাশ থেকে নেমে আসা এক নীরব দয়া, যা পৃথিবীর ব্যস্ত ও ক্লান্ত জীবনে নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ দেয়। এজন্যই হয়ত মহানবী (সা.) বলেছেন, যখন রমজান আসে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। (বুখারি, হাদিস : ১৮৯৮)

সারা বছর আমরা দৌড়াই প্রয়োজন, দায়িত্ব এবং আকাঙ্ক্ষার পেছনে। এই দৌড়ে কখন যে হূদয় কঠিন হয়ে যায়, সম্পর্ক দূরত্বে ঢেকে যায়, আর আত্মা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তা টেরও পাই না। রমজান এসে প্রথমেই আমাদের থামতে শেখায়। এটি আমাদের বলে, জীবনের আসল শক্তি অর্জনে নয়, সংযমে; কোলাহলে নয়, নীরব চিন্তায়। এক কথায় বলতে গেলে এটি আমাদের তাকওয়া অর্জনের তালিম দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, রমজান কেবল না খাওয়ার মাস নয়। এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের এক প্রশিক্ষণশালা, যেখানে মানুষ শিখে কীভাবে নিজের ইচ্ছাকে পরিচালনা করতে হয়। দিনের আলোয় বৈধ খাদ্য থেকেও বিরত থাকা মানুষের ভেতরে এক গভীর বার্তা সৃষ্টি করে যে স্বাধীনতা মানে সবকিছু পাওয়া নয়; বরং প্রয়োজন হলে নিজেকে থামাতে পারা। এই থামার ক্ষমতাই চরিত্রের ভিত্তি।

এই মাস মানুষকে আল্লাহসচেতনতার এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। একাকী অবস্থায়ও যখন একজন রোজাদার সংযম বজায় রাখে, তখন সে অনুভব করে, তার জীবনে একটি নীরব জবাবদিহি আছে। এই অনুভূতি মানুষের আচরণকে ভেতর থেকে পরিশুদ্ধ করে। আইন বা সামাজিক চাপ নয়, অন্তরের নৈতিক বোধ তখন প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

রমজান সহমর্মিতারও মাস। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ আছে যাদের কাছে এই অভাব প্রতিদিনের বাস্তবতা। তাই রমজান কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সামাজিক দায়িত্ববোধের পুনর্জাগরণ। দান, সহানুভূতি এবং সম্পর্ক মেরামতের সংস্কৃতি এই মাসে নতুন করে জেগে ওঠে। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) অধিক দানশীল ছিলেন, রমজান এলে তাঁর দানশীলতার মাত্রা আরো বহু গুণে বেড়ে যেত। (বুখারি, হাদিস : ৬)

দার্শনিকভাবে রমজান মানুষের অগ্রাধিকারের তালিকা পুনর্গঠন করে। যা জরুরি মনে হত, তা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়; আর যা উপেক্ষিত ছিল, তা গুরুত্ব পায়। সময়ের মূল্য, নীরবতার মূল্য, কমে থাকার সৌন্দর্য, কৃতজ্ঞতার গভীরতা—এই সব শিক্ষা ধীরে ধীরে হূদয়ে বসে যায়।
রমজানের প্রথম দিনগুলো তাই শুধু একটি সূচনা নয়; এটি একটি আমন্ত্রণ। অতীতের ভুল থেকে ফিরে আসার, সম্পর্ককে নতুন করে গড়ার, এবং নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে শান্ত করার আমন্ত্রণ। এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, বিনয় এবং পরিবর্তনের ইচ্ছা।

আজ যখন আমরা রমজানকে স্বাগত জানাই, তখন আমাদের সামনে একটি সিদ্ধান্তও আসে। আমরা কি এটিকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক মাস হিসেবে পার করব, নাকি এটিকে আমাদের জীবনের নতুন নৈতিক সূচনার মুহূর্তে পরিণত করব। রমজানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে এই সিদ্ধান্তের ওপর। রমজানের দিনগুলোতে মুমিনের উচিত, মহানবী (সা.)-এর বাণী – ‘ভুলুণ্ঠিত হোক তার নাক, যার নিকট রমজান মাস এলো অথচ তার গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার পূর্বেই তা পার হয়ে গেল। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৫)’ বেশি বেশি স্মরণ করা।

অতএব, আসুন রমজানকে শুধু শুভেচ্ছায় নয়, প্রস্তুত হূদয়ে স্বাগত জানাই। সংযমকে শক্তি, সহমর্মিতাকে দায়িত্ব, আর আল্লাহসচেতনতাকে জীবনের কেন্দ্র করে যদি আমরা এই মাসে প্রবেশ করি, তবে রমজান আমাদের ভেতরে এমন এক পরিবর্তনের বীজ বপন করবে, যা শুধু এক মাস নয়, পুরো বছরজুড়ে আমাদের জীবনকে আলোকিত করবে।

সর্বশেষ সংবাদ

‘যে শিক্ষা ব্যবস্থা বেকারত্ব বাড়ায়, তা বাদ দিয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে’

বাংলা ভাষাকে সব জায়গায় গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ব দরবারে করতে হবে প্রতিষ্ঠিত— এমনটাই জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ