spot_img

মার্কিন সমাজে গভীর হচ্ছে বিভাজন

অবশ্যই পরুন

ট্রাম্প প্রশাসন যখন কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে, তখন একদিকে সংখ্যালঘু পরিচয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ধরে রাখতে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকরা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বর্ণবাদী নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রচার করছে। এই দ্বিমুখী দানবায়ন’ মার্কিন সমাজে আবেগগত মেরুকরণ এবং আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভাজন আরও তীব্র করেছে।

মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ১৭ দিনের ব্যবধানে মার্কিন ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারীদের (আইস) হাতে দু’মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা আবারও যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘস্থায়ী সহিংস পুলিশি ব্যবস্থাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় বছর পর, একই এলাকার কাছাকাছি ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে—বর্ণবৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, ব্যাপকহারে অস্ত্র প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ কীভাবে মার্কিন সমাজকে ভারাক্রান্ত করছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলাদলি সংস্কারের পথকে আরও জটিল করে তুলছে।

রাজপথে হত্যা

মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে তীব্র শীত উপেক্ষা করে গত ২৫ জানুয়ারি শত শত মানুষ জড়ো হলে ৩৭ বছর বয়সী আইসিইউ নার্স অ্যালেক্স প্রেট্টির মৃত্যুর প্রতিবাদে। আগেরদিন ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন তিনি।

মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের এক মুখপাত্র দাবি করেন, প্রেট্টি নাকি একটি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এগিয়ে এসে সহিংসভাবে প্রতিরোধ করেছিলেন, ফলে কর্মকর্তারা ‘আত্মরক্ষামূলক গুলি’ চালাতে বাধ্য হন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রেট্টির হাতে ছিল একটি মোবাইল ফোন—তার কাছে অস্ত্র থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

এই হত্যাকাণ্ডটি চলতি মাসে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন-সংক্রান্ত দ্বিতীয় প্রাণঘাতী অভিযানের উদাহরণ। এর আগে ৭ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তারা তিন সন্তানের জননী ৩৭ বছর বয়সী রেনে গুডকে গুলি করে হত্যা করে। ঘটনাস্থলটি জর্জ ফ্লয়েড হত্যার স্থান থেকে মাত্র ১.৬ কিলোমিটার দূরে।

এই দু’হত্যাকাণ্ড ঘিরে মিনিয়াপোলিসে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এগুলোকে ‘রাজপথে হত্যা’ ও ‘ঠান্ডা মাথার খুন’ বলে আখ্যা দিয়ে ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারী সহিংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট লিডিয়া পলগ্রিন লিখেছেন, ‘মিনিয়াপোলিসে আমি যেন এক ধরনের গৃহযুদ্ধের আভাস দেখেছি।’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শত শত শহরে ‘ন্যাশনাল শাটডাউন’ -ব্যানারে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ‘কাজ নয়, স্কুল নয়, কেনাকাটা নয়’ —এই আহ্বানে আইসের সহিংস অভিযান ও সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়।

ব্যাপক সহিংসতার চিত্র

২০০৩ সালে গঠিত আইস বর্তমানে সবচেয়ে বড় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। জার্মান দৈনিক টাগেসশ্পিগেল-এর তথ্যমতে, গত গ্রীষ্ম থেকে আইসের কর্মকর্তারা অন্তত ৩১টি অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় জড়িত ছিলেন, এতে ১১ জন হতাহত হন এবং হেফাজতে নিহত হয়েছেন ৩২ জন। বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ আইসের ডিটেনশন সেন্টারে আটক রয়েছেন।

আইস এই সমস্যার শীর্ষে আছে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোর গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অসদাচরণের কারণে আহত হন এবং ৬০০-এর বেশি মানুষ পুলিশের হাতে মারা যান। ‘ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স’ প্রকল্প জানায়, শুধু ২০২৫ সালেই মার্কিন পুলিশ ১,৩১৪ জনকে হত্যা করেছে—যেখানে পুরো বছরে মাত্র ছয় দিন এমন গেছে, যেদিন কোনো পুলিশি হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।

মার্কিন আইনপ্রয়োগকারী সহিংসতার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত দেশটির ইতিহাসে। ১৮শ শতকে দক্ষিণাঞ্চলের দাস পাহারাদার দলগুলোই ছিল প্রথম অনানুষ্ঠানিক পুলিশ, যাদের সহিংসতার বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এই ইতিহাসের ফলেই আইনপ্রয়োগকারী ব্যবস্থার জন্মলগ্ন থেকেই বর্ণবাদী পক্ষপাত রয়ে গেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালের পর থেকে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার ঝুঁকি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় প্রায় ২.৮ গুণ বেশি।

একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও সহিংসতার সম্পর্কও স্পষ্ট। দরিদ্র এলাকায় পুলিশি সহিংসতায় মৃত্যুর হার ধনী এলাকার তুলনায় তিন গুণের বেশি।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। দেশটিতে ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে—যা জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে পুলিশ প্রতিটি অভিযানে অস্ত্রধারী ব্যক্তির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় কাজ করে, যা তাদের মানসিকতা ও প্রশিক্ষণকে প্রভাবিত করে।

‘ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তি’

সহিংসতার অভিযোগ বাড়লেও খুব কম পুলিশ সদস্য শাস্তির মুখোমুখি হন। এর অন্যতম কারণ ‘কোয়ালিফায়েড ইমিউনিটি’ বা ক্ষমতাবান দায়মুক্তি নীতি, যা ১৯৮২ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রবর্তন করে।

এই নীতির আওতায়, কোনো কর্মকর্তা যদি ‘স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত’ আইন বা সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন না করেন, তবে তিনি দায়মুক্ত থাকেন। বাস্তবে এই ধারা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।

জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকারী ডেরেক শভিনের বিরুদ্ধেও এর আগে ১৭টি অভিযোগ ছিল, যার ১৬টিই শাস্তি ছাড়াই নিষ্পত্তি হয়।

এই সহিংসতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট। রিপাবলিকানরা নিহতদের ‘উগ্রপন্থী’ আখ্যা দিচ্ছেন, আর ডেমোক্র্যাটরা পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা করছেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে উভয় দলই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ব্যস্ত। এর ফলে আইনপ্রয়োগকারী ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংস্কার রাজনৈতিক টানাপোড়েনে আটকে আছে।

টাইম ম্যাগাজিনের ভাষায়, এটি এমন একটি জাতির চিত্র যা ক্রমেই দলীয় বিদ্বেষে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ছে—যেখানে সহিংস পুলিশি আচরণ সেই বিভক্তিরই পুনরাবৃত্তির প্রতিফলন।

সূত্র: সিনহুয়া

সর্বশেষ সংবাদ

রাফাহ সীমান্ত পুনরায় খোলা ফিলিস্তিনিদের ‘অর্জিত অধিকার’: হামাস

হামাসের সশস্ত্র শাখার মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেছেন, রাফাহ সীমান্ত পুনরায় খোলা ফিলিস্তিনি জনগণের ‘অর্জিত অধিকার’। ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমে উদ্ধৃত মন্তব্যে...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ