ভারতের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক ভি কামাকোটি যখন শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হওয়ার ঘোষণা পেলেন, তখন সেটি প্রশংসার পাশাপাশি নতুন করে উসকে দিল পুরোনো এক বিতর্ক। গোমূত্র ও গোবর নিয়ে তাঁর গবেষণা-সংক্রান্ত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাঁকে কটাক্ষ করে পোস্ট দেয় কংগ্রেসের কেরালা ইউনিট। এর জবাবে পাল্টা অবস্থান নেন জোহোর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বু। ফলাফল—রাজনীতি, বিজ্ঞান ও আদর্শের সংঘাতে প্রকাশ্য বাগ্যুদ্ধ।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভি কামাকোটিকে পদ্মশ্রী সম্মানে মনোনীত করা নিয়ে কেরালা কংগ্রেস কটাক্ষ করলে তার জবাবে সরব হন ভারতের বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জোহোর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বু। এরপর থেকেই এক্সে কেরালা কংগ্রেস ও ভেম্বুর মধ্যে তীব্র বাক্বিতণ্ডা শুরু হয়।
পদ্মশ্রী সম্মান পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ভি কামাকোটি বলেন, পদ্মশ্রী পুরস্কার আমার কাছে একটাই অর্থ বহন করে—“বিকশিত ভারত ২০৪৭”-এর লক্ষ্যে আমি আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। এই সম্মান কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়; এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
এই বক্তব্যের পরই কংগ্রেসের কেরালা ইউনিট এক্সে ব্যঙ্গাত্মক সুরে পোস্ট করে, ‘ভি কামাকোটিকে এই সম্মান পাওয়ার জন্য অভিনন্দন। আইআইটি মাদ্রাজে আপনার গরুর মূত্র নিয়ে “ব্লিডিং এজ” গবেষণার জন্য দেশ আপনাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে—গোমূত্রকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার জন্য।’
তবে সেই বিতর্কের জবাবে কামাকোটি বলেছিলেন, ‘গোমূত্রের অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’
কেরালা কংগ্রেসের কটাক্ষের পাল্টা জবাবে জোহোর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বু প্রকাশ্যে কামাকোটির পক্ষে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘প্রফেসর কামাকোটি মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইনের মতো ডিপ টেক নিয়ে কাজ করেন। তিনি ভারতের সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক এবং এনএসএবির সদস্য। এই সম্মান তিনি যথার্থভাবেই প্রাপ্য।’
ভেম্বু আরও বলেন, তিনি বৈজ্ঞানিক যুক্তির ভিত্তিতেই কামাকোটিকে সমর্থন করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। তাঁর ভাষায়, ‘গোবর ও গোমূত্রে উৎকৃষ্টমানের মাইক্রোবায়োম রয়েছে, যা মানুষের জন্য মূল্যবান হতে পারে।’
এর জবাবে কেরালা কংগ্রেস পাল্টা প্রশ্ন তোলে গবেষণার বাস্তব ফলাফল নিয়ে। তারা বলে, ‘গবেষণা মানে প্রেক্ষিতের বাইরে থেকে এলোমেলো কিছু পশ্চিমা গবেষণাপত্র উদ্ধৃত করা নয়। গোবর ও গোমূত্র নিয়ে এই গবেষণাগুলোর ফলাফল কী? আর আমরা কেন শুধু গোবরেই সীমাবদ্ধ থাকছি? মহিষ, ছাগল বা এমনকি মানুষের মলমূত্র নিয়েও তো গবেষণা করা যেতে পারে।’
তারা আরও উল্লেখ করে, মধ্যপ্রদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত একটি পঞ্চগব্যভিত্তিক ক্যানসার গবেষণা প্রকল্পের কথা। পঞ্চগব্য হলো গোবর, গোমূত্র, দুধ, দই ও ঘি দিয়ে তৈরি একটি প্রথাগত মিশ্রণ।
কেরালা কংগ্রেসের দাবি, অতিরিক্ত কালেক্টর রঘুভার মারাভির তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে—এই প্রকল্পে গোবর ও গোমূত্র কিনতেই ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১.৯২ কোটি টাকা, যেখানে প্রকৃত খরচ হওয়ার কথা ছিল মাত্র ১৫–২০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ছিল ৩.৫ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে গাড়ি কেনা, জ্বালানি ও গোয়া-বেঙ্গালুরু সফরে।
কংগ্রেসের অভিযোগ, এ ধরনের আরও প্রকল্প তদন্তের আওতায় এলে একের পর এক কেলেঙ্কারি সামনে আসবে।
তারা আরও বলে, ‘ক্যানসার গবেষণার প্রয়োজন আছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কেন আপনারা জোর দিয়ে বলছেন যে শুধু গোবর বা গোমূত্রই ক্যানসার সারাতে পারে? কোভিডের সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে প্রতারকেরা গোবর ও গোমূত্র দিয়ে ভাইরাস মারার চেষ্টা করেছিল। তার ফলাফল কী হয়েছিল?’
সবশেষে কেরালা কংগ্রেস সরাসরি শ্রীধর ভেম্বুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলে, ‘আপনি যেহেতু একজন বিলিয়নিয়ার এবং গোমূত্রের তথাকথিত জাদুকরি উপকারিতায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনার সংস্থা কেন গোবর ও গোমূত্র নিয়ে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ করছে না? যদি গোমূত্র সত্যিই ক্যানসার নিরাময়ে সহায়ক হয়, তবে তা হবে বিশ্বের জন্য ভারতের অন্যতম বড় অবদান। শুধু কথা নয়—কেন আপনি টাকাও লাগাচ্ছেন না?’
সূত্র- এনডিটিভি ও হিন্দুস্থান টাইমস

