ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি দিকের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে—ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে সামাজিক শালীনতা পর্যন্ত। নারীর পর্দা ও শালীনতার প্রশ্নে ইসলামের নির্দেশনা বরাবরই সুস্পষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত। নেকাব বা চেহারা আবৃত রাখা এই পর্দাব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা নবীযুগ থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে দ্বিনদার মুসলিম নারীদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে অনুসৃত হয়ে আসছে।
নবীজি (সা.)-এর পবিত্র যুগে তাঁর সব স্ত্রী—উম্মুল মুমিনিন—পরপুরুষের সামনে চেহারা আবৃত রাখতেন। তাঁদের অনুসরণেই সাহাবায়ে কেরামের পরিবারসমূহে, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগে এবং মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের দীর্ঘ সময়জুড়ে নেকাব একটি সম্মানজনক ও স্বীকৃত ইসলামী আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সংস্কৃতির আবিষ্কার নয়; বরং কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক এক সুসংহত শরয়ি বিধান।
কোরআন ও জিলবাবের বিধান
পবিত্র কোরআনে নারীর পর্দা ও শালীনতার বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। সুরা আহজাবের ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের জিলবাবের একাংশ নিজেদের ওপর নামিয়ে দেয়।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৯)
‘জিলবাব’ শব্দের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেছেন—এটি এমন বড় চাদর, যা নারীর মাথা, মুখমণ্ডল ও পুরো দেহ আবৃত করতে সক্ষম। ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, জিলবাব দ্বারা মুখমন্ডলসহ পূর্ণ দেহ আবৃত করাই উদ্দেশ্য। এই আয়াতের বাস্তব প্রয়োগ নবীজির যুগ থেকেই শুরু হয়েছে এবং মুসলিম সমাজে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা সংরক্ষিত হয়েছে।
সুরা আহজাবের ৩৩ ও ৫৩ নং আয়াত, সুরা নুরের ৩১ নং আয়াত এবং সহিহ হাদিসসমূহ সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করে, পরপুরুষের সামনে নারীর সৌন্দর্য গোপন রাখা ফরজ পর্যায়ের নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) লিখেছেন—এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, বাইরে বের হওয়ার সময় নারীর মুখমন্ডল আবৃত রাখা অপরিহার্য, যাতে দুষ্ট লোকদের কুদৃষ্টি থেকে সে নিরাপদ থাকে।
হাদিসে নেকাবের প্রমাণ
সহিহ হাদিসেও নেকাবের বাস্তব চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন— ‘ইহরাম অবস্থায় নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৩৮)
এই হাদিসের তাত্পর্য অত্যন্ত স্পষ্ট। ইহরাম অবস্থায় যদি নেকাব নিষিদ্ধ করা হয়, তবে বুঝতে হবে—ইহরামের বাইরে স্বাভাবিক অবস্থায় নারীরা নেকাব পরিধান করতেন বলেই এ বিশেষ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন—ইহরামের সময় যখন পুরুষদের কাফেলা আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত, তখন আমরা ওড়না টেনে চেহারা ঢেকে নিতাম; তারা চলে গেলে তা সরিয়ে নিতাম। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৯৩৫)
এই বর্ণনা প্রমাণ করে, পরপুরুষের উপস্থিতিতে চেহারা আবৃত রাখা সাহাবী নারীদের স্বতঃসিদ্ধ আমল ছিল।
ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত
চার মাজহাবের ইমাম ও পরবর্তী যুগের মহাপণ্ডিতরা নেকাবের বিধানকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন—পরপুরুষের সামনে নারীর হাত, পা ও মুখ খোলা রাখার কোনো অবকাশ নেই। (মাজমুআতুল ফাতাওয়া : ২২/১১৪)
ইবনুল কাইয়িম (রহ.) উল্লেখ করেন—নামাজের সময় মুখ খোলা রাখা বৈধ হলেও বাজার বা জনসমাগমে তা গ্রহণযোগ্য নয়। (ইলামুল মুয়াক্কিয়িন : ২/৪৭)
হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—চার মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহে পরপুরুষের সামনে চেহারা আবৃত রাখার বিধান স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, নেকাব কোনো বিচ্ছিন্ন বা বিতর্কিত মত নয়; বরং ইসলামী শরিয়তের মূলধারার অংশ।
লেখক : শায়খুল হাদিস, আল জামিয়া হালিমাতুস সাদিয়া গাজীপুর।

