একটি তারাভরা রাতে একজন মানুষ গভীর মনোযোগে আকাশের তারা দেখছিল। হঠাত্ সে একটি কুয়োর মধ্যে পড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন—‘তুমি আকাশ নিয়ে এত ভাবো, অথচ পায়ের নিচে কী আছে, সে খবরও রাখো না!’
মানুষ যখন কোনো একটি জিনিস দেখে, তখন সে একই সঙ্গে অসংখ্য অন্য জিনিস দেখা থেকে বঞ্চিত হয়। সে একটি বিষয়ের দিকে তাকায়, আর অগণিত বিষয়কে উপেক্ষা করে। অথচ এমনও হতে পারে, যেগুলো সে দেখছে না, সেগুলোই তার দেখা বিষয়টির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পথিক যদি রাস্তার এক পাশে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয়, তবে অন্য দিক থেকে আসা গাড়ি তাকে চাপা দিতে পারে। যে সাপের ভয়ে দৌড়ায়, সে কখনো সিংহের শিকার হয়ে যায়।
ঠিক তেমনি, মানুষ যখন কোনো একটি কথা শোনে, তখন সে একই সময়ে অনেক কথাই শুনতে পায় না। শ্রেণিকক্ষে কোনো ছাত্র তার সহপাঠীর কথা শুনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আর শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ কথা তার কানে পৌঁছায় না।
কত মানুষ আছে, যারা শত্রুর কথা মন দিয়ে শোনে, অথচ শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধুদের কণ্ঠস্বর তাদের কানে পৌঁছায় না!
একইভাবে যখন কেউ কোনো একটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, তখন সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে গাফিল হয়ে পড়ে।
একজন গবেষক কোনো একটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তার সমস্ত যোগ্যতা ও সময় তাতে ব্যয় করে। অথচ সেই গবেষণার উপকার সীমিত হতে পারে, আর তখন আরও বহু বিষয় থাকে, যেগুলো অধিকতর গবেষণার দাবি রাখে, কিন্তু তার কাছে আর সময় থাকে না। অনেক সময় মানুষ যে বিষয় নিয়ে চিন্তা করে এবং যার উপকারিতা সম্পর্কে ক্রমেই নিশ্চিত হতে থাকে, ঠিক সেই সময়েই তার ক্ষতিকর দিকগুলো তার চোখের আড়ালে থেকে যায়।
মানুষ যা দেখে না, শোনে না, বা বোঝে না, তা দুই প্রকার—
প্রথমত, এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো অন্য কেউও দেখে না, শোনে না, বোঝে না। এগুলোই ‘গায়েবি বিষয়’। এসব সম্পর্কে মানুষের দায়িত্ব হলো, গায়েবের জ্ঞানদাতা আল্লাহর শিক্ষার ওপর চিন্তা করা এবং দৃশ্যমান, শ্রবণযোগ্য ও অভিজ্ঞতার বিষয়গুলোর চেয়েও এগুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। কারণ এগুলোকে উপেক্ষা করলে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এ কারণেই কোরআনে বলা হয়েছে—‘তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাত উত্তম ও স্থায়ী। এবং আখিরাতের মর্যাদা অনেক বড় এবং শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা আলা, আয়াত : ১৬-১৭)
কোরআনে এমন বহু জ্ঞান আছে, যা মূলত অত্যন্ত স্পষ্ট; কিন্তু মানুষের জন্য সেগুলো উপলব্ধি করা অনেক সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো, এই উচ্চতর সত্যগুলোর ব্যাপারে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করা, মূর্খদের মতো সেগুলো নিয়ে জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য করা নয়।
দ্বিতীয়ত, এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো অন্যরা দেখে, শোনে ও বোঝে, কিন্তু সে ব্যক্তি তা পারে না। এ ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব হলো, বিশ্বস্ত, আন্তরিক ও জ্ঞানী শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে পরামর্শ করা, বিনয়ের সঙ্গে তাদের কথা শোনা এবং নিজের ইচ্ছামতো চলা থেকে বিরত থাকা। অন্যথায় সে নিজে পথভ্রষ্ট হবে এবং তার অনুসারীরাও পথভ্রষ্ট হবে।
দেখা, শোনা ও বোঝার এই সীমাবদ্ধতার কারণেই আল্লাহ তাআলা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারীদের কাছে ফিরে যাওয়ার এবং তাদের সঙ্গে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তাঁর প্রিয় নবীকেও অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বলা হয়েছে। পরামর্শের উপকার হলো, এর মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক কিছু দেখা যায়, অনেক কথা শোনা যায় এবং বহু সমস্যার সমাধান বোঝা যায়।
সুতরাং, যেমন গুরুত্বপূর্ণ আমরা নিজেরা দেখা, শোনা ও বোঝার চেষ্টা করি, তেমনি এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা জানার চেষ্টা করি অন্যরা কী দেখছে, কী শুনছে এবং কী বুঝছে। অর্থাত্ আমরা সেই বিষয়গুলো দেখার চেষ্টা করি, যেগুলো আমরা এখনো দেখিনি; সেই কথাগুলো শোনার চেষ্টা করি, যেগুলো আমরা এখনো শুনিনি; এবং সেই সমস্যাগুলো উপলব্ধি করি, যেগুলো আমরা নিজের অজ্ঞতা ও অবহেলায় উপেক্ষা করেছি।
অজ্ঞতা, উদাসীনতা, আত্মঅহংকার, সংকীর্ণ দৃষ্টি, আত্মতুষ্টি, খামখেয়ালিপনা ও ঔদ্ধত্য—এগুলো কত মানুষ, কত জাতি ও কত সভ্যতা ধ্বংস করে দিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
বারবার এমন হয়েছে—যাকে মানুষ সত্য মনে করেছে, সেটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে; আর যাকে দোষারোপ করেছে, সেটাই সঠিক ছিল।

