চলমান বাস্তবতায় দ্বিধাহীন সত্য, সভ্যতা এগুচ্ছে; রূঢ়তার হাতধারে। মিথ্যার পরিশীলিত পরিভাষা অসত্যভাষণ। ঘৃতকাঞ্চন হলো শাশুড়ির জিহ্বা! জিজ্ঞাসা ও উত্তরদানের রীতি আক্রমণাত্মক। এখন মুখের কথা হয়ে যাচ্ছে মেশিন গান!
অথচ মানব বৈশিষ্ট্যের অন্যতম উপাদান, সৃজনশীল শক্তি ও গুণ হলো ভাষা। পবিত্র কোরআনের বাণী—‘তিনিই দয়াময় (আল্লাহ) সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশের উপায়।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত : ৪)
ইসলামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত এবং অনর্থক বাক্যব্যয় নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তোমরা তা মুখে মুখে ছড়িয়ে দিচ্ছিলে এবং এমন বিষয় তোমরা উচ্চারণ করছিলে মুখে, যে সম্পর্কে তোমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান ছিলো না। তোমরা বিষয়টিকে একটি সাধারণ কথা মনে করে ছিলে; অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিলো অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।’ (সুরা নুর, আয়াত : ১৫)
আয়াতে অসংযত কথাবার্তার মারাত্মক বিরূপতা বর্ণিত হয়েছে।
প্রিয় নবী (সা.) আরো বলেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি, তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৮ )
জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ এমন—তিনি বলতেন ‘তোমরা এ বিষয়ে জানো?’ বলতেন—‘আমি কি তোমাদের এব্যাপারে বলবো…’। প্রিয় নবী (সা.) কিছু জিজ্ঞাসা করলে সাহাবিরা সাধারণত নিরব থাকতেন অথবা বলতেন—‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সর্বাধিক জানেন।’
অন্ধসাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতুম (রা.) বলতেন—‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.), আমাকে তা জানান, আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন।’
কথাকাজে সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ হলো ‘মুনাফিকি’। মহান আল্লাহর নির্দেশ—‘তোমরা সত্যের সঙ্গে মিথ্যার মিশ্রণ করো না এবং জেনেশুনে সত্যকে গোপন করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪২)
এমন কথা বলা অনুচিত, যার বাস্তবতা নেই—
‘…আল্লাহর কাছে অতি ঘৃণার তাহা
এমন কথা বলো, করো না যাহা।’ (সুরা সাফ, আয়াত : ০৩)
প্রসঙ্গত পবিত্র কোরআনের কয়েকটি নির্দেশনা—
‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৭০)
সুন্দর বাচনিক উপস্থাপন
‘তারা যেন এমনভাবে কথা বলে যা সবচেয়ে সুন্দর। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।’ (সুরা বানি ইসরাইল, আয়াত : ৫৩)
উচ্চবাচ্য পরিহার
‘…এবং তোমার আওয়াজ নিচু রাখো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৯)
সম্মানিতজন, পরিবেশ বিবেচনা
‘তোমরা নবীর আওয়াজের উপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না এবং তোমরা নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো তাঁর সঙ্গে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ০২)
আয়াতটি সম্মানিতজনের সামনে নিচুগলায় কথা বলার চিরন্তন শিষ্টাচার শেখায় এবং এটাই মর্যাদাপূর্ণ ও ভদ্রতার প্রকাশ।
সবিনয় উপস্থাপন
‘..এবং রহমানের বান্দারা ভূপৃষ্ঠে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন মূর্খরা তাদের সঙ্গে কথা বলে তখন তারা বলে শান্তি (সালাম)…।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৩)
‘আর যখন তোমাদের অভিবাদন (সালাম) করা হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম জবাব দাও অথবা অনুরূপ জবাব দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৮৬)
তুচ্ছ তাচ্ছিল্য না করা
‘তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমান আনার পর মন্দ নাম কতোই না নিকৃষ্ট…।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)
জেনে বুঝে মুখখোলা
‘আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।’ (সুরা বানি ইসরাইল, আয়াত : ৩৬)
অনর্থক কথকতা বর্জন মুমিনের বৈশিষ্ট্য
‘এবং যারা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৩)
কাজেই বিব্রতকর, হীন উদ্দেশ্যে অবান্তর জিজ্ঞাসা ইসলামে বর্জনীয়। মহান আল্লাহর নির্দেশ—‘হে মুমিনরা, তোমরা সেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না, যা তোমাদের কাছে প্রকাশ পেলে তোমরা কষ্ট পাবে…।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ১০১)
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ (কাপাসিয়া, গাজীপুর)।

