পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এক সময় মুক্ত বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য পরিচিত এই দ্বীপ এখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল-এর মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সামরিক গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির মুখে অবস্থিত এই দ্বীপটি ভৌগোলিকভাবে এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রায় ১,৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপকে অনেকেই “ছিপি”-র সঙ্গে তুলনা করেন, কারণ এটি প্রণালির প্রবেশপথকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে।
এক সময় এর লবণের গুহা, পান্না-রঙা ম্যানগ্রোভ বন এবং অনন্য শিলা গঠনের কারণে পর্যটকদের কাছে এটি ছিল এক উন্মুক্ত ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের নজর পড়েছে এর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায়— যা “ক্ষেপণাস্ত্র নগরী” নামে পরিচিত।
সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই, গত ৭ মার্চ, মার্কিন বিমান হামলায় দ্বীপটির একটি গুরুত্বপূর্ণ লোনা পানি শোধনাগার ধ্বংস হয়। তেহরান এই ঘটনাকে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ বলে উল্লেখ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেশম দ্বীপের ভূগর্ভে বিস্তৃত একটি জটিল নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লুকানো থাকতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত লেবানিজ সামরিক বিশ্লেষক হাসান জৌনির মতে, এই অবকাঠামোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে হরমুজ প্রণালিকে প্রয়োজনে অচল করে দেওয়া—যা ইতোমধ্যেই আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে খুব সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নৌপথ সচল রাখতে নৌ-কনভয় গঠনের চেষ্টা করছেন।
দ্বীপটির প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম এবং তারা ‘বান্দারি’ উপভাষায় কথা বলেন। তাদের জীবন এখনো সমুদ্রনির্ভর, যার প্রতিফলন দেখা যায় ‘নওরোজ সায়্যদি’ উৎসবে—যেখানে সমুদ্রের প্রতি সম্মান জানিয়ে একদিন মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।
১৫৫২ সালে অটোমান সেনাপতি পিরি রেইস দ্বীপটি দখল করেন। পর্তুগিজরা ১৬২১ সালে এখানে দুর্গ নির্মাণ করলেও এক বছর পর পারস্য-ইংরেজ যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়।
উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা ‘বাসিডু’ এলাকায় নৌঘাঁটি স্থাপন করে, যা ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। পরে ১৯৩৫ সালে রেজা শাহ পাহলভির অনুরোধে তারা সেই ঘাঁটি ত্যাগ করে।
সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি কেশম একটি প্রাকৃতিক বিস্ময়ও। এখানে রয়েছে ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘কেশম জিওপার্ক’, বিরল ‘হারা’ ম্যানগ্রোভ বন, ‘ভ্যালি অফ স্টারস’, প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘নমকদান’ লবণ গুহা এবং ‘চাহকুহ’ গিরিখাত—যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য উদাহরণ।
আজ কেশম দ্বীপ একদিকে যেমন আধুনিক জ্বালানি রাজনীতির কেন্দ্র, অন্যদিকে তার প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস এখনো এই অঞ্চলটির দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্বের সাক্ষ্য বহন করছে।
সূত্র: আল-জাজিরা

