মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী বায়তুল মামুর জামে মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুর রহিম কাসেমী জুমার খুৎবা-পূর্ব বয়ানের বলেন, ইতিকাফ আল্লাহ’র সান্নিধ্য লাভের এক মহিমান্বিত ইবাদত। ইতিকাফকারী আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ প্রেমে আসক্ত মহান ব্যক্তি। মহান রাব্বি কারিমের কাছে ইতিকাফকারী বড়ই সম্মানী। আল্লাহ তা’আলা তার সব গুনাহ মাফ করে দেন। রবের পক্ষ থেকে জান্নাতের মধ্যে তার জন্য একটি স্পেশাল দরজা বরাদ্দ থাকে। কারণ ইতিকাফকারী দুনিয়াবি সব কাজ ছেড়ে দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদে অবস্থান করেন। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। মহল্লার মসজিদে কেউই ইতিকাফ না করলে সবাই গুনাহগার হবে। মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনুল কারিমে মসজিদগুলোকে ইতিকাফকারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা। খতিব বলেন, ইতিকাফের কেউ মান্নত করলে কার জন্য ইতিকাফ ওয়াজিব হয়ে যায়। আবার রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ বড় ফজিলতের। এছাড়াও এখনো সময় নকল ইতিকাফের নিয়ত করা যায়। এতে অনেক চাওয়া পাওয়া যায়।
মহান আল্লাহ তায়ালা ইতিকাফের গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে সেই সব লোকের জন্য পবিত্র করো, যারা (এখানে) তাওয়াফ করবে, ইতিকাফ করবে এবং রুকু ও সিজদা করবে।’ (সূরা বাকারা , আয়াত নং-১২৫) অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনÑ ‘তোমরা মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৭) হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ইতিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর ২০ রাত (দিন) ইতিকাফ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস-২৪৬৩) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতিকাফ করে, আল্লাহ তার ও জাহান্নামের মাঝে তিনটি পরিখা তৈরি করে দেন, যার দূরত্ব আকাশ ও জমিনের দূরত্ব থেকেও বেশি। (তাবরানি শরিফ) অতএব আসুন এই পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশকের আমরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য মহল্লার মসজিদে ইতিকাফ করি। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। অন্যায় ভাবে ইঙ্গ-মার্কিন কর্তৃক মুসলিমদের উপরে যুদ্ধের তীব্র প্রতিবাদ করি। আল্লাহর কাছে আবেদন করি আল্লাহ তা’আলা যেন মজলুম মুসলমানদের বিজয় দান করেন। আল্লাহ তা’আলা এই মিল্লাতকে কবুল করেন। আমিন।
মাহে রমজানে জাকাত আদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক গতকাল জুমার বয়ানে বলেন, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ এর মধ্যে জাকাত একটি ফরজ বিধান। জাকাত ঈমানের দলিল। জাকাত অসহায় গরিবদের হক। জাকাত দুনিয়াতেও ফায়দা আখিরাতেও ফায়দা। পবিত্র কুরআনে জাকাত সম্পর্কে ব্যাপক নির্দেশনা রয়েছে। খতিব বলেন, জাকাত আদায়ের দ্বারা সম্পদ বাড়ে। আর সুদের দ্বারা সব আমল বরবাদ হয়। আল্লাহকে খুশি করার জন্য জাকাত দিতে হবে। জাকাতে বরকত হয় আর সুদ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে। খতিব বলেন, জাকাত একটি ইবাদত। জাকাত সম্পদের জরিমানা নয়। জাকাত আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য। স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাকাত আদায় করতে হবে। জাকাতকে সম্পদের জরিমানা মনে করা যাবে না। জাকাত প্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আল্লাহকে হাজির নাজির করে বিনয়ের সাথে জাকাত আদায় করতে হবে।
টঙ্গী পূর্ব আরিচপুর সরকার বাড়ি ঈদগাহ মসজিদুল আকসার খতিব মাওলানা রিয়াদুল ইসলাম মল্লিক জুমার খুৎবা-পূর্ব বয়ানে বলেন, ইতিকাফ আরবি শব্দ। যার অর্থ হলোÑ অবস্থান করা, অভিমুখী হওয়া, নিবেদিত হওয়া, নিরবচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি। পরিভাষায় ইতিকাফ হলোÑ রমজান মাসের শেষ দশকে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশে দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততাকে গুটিয়ে, এমন মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। ইতিকাফ তিন প্রকার। রমজানের শেষ দশকে একুশ তারিখের রাত অর্থাৎ ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগ থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত ইতিকাফ করা।
নবী করিম (সা.) প্রতি বছর এ দিনগুলোতে ইতিকাফ করতেন, তাই একে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়। নফল ইতিকাফ : রমজানের শেষ দশকে পূর্ণ ১০ দিনের কম ইতিকাফ করা। অথবা বছরের অন্য যেকোনো সময় যতক্ষণ ইচ্ছা, ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। ওয়াজিব ইতিকাফ : মান্নতকৃত ইতিকাফ এবং সুন্নত ইতিকাফ ফাসেদ হয়ে গেলে তার কাজা আদায় করা ওয়াজিব, এতে রোজা রাখা জরুরি। তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের অন্যতম সেরা মাধ্যম হলো রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ, এর মাধ্যমে জাগতিক কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মসজিদে অবস্থান করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত ও আত্মশুদ্ধি অর্জন করা যায়। এটি মূলত আল্লাহর নৈকট্য, লাইলাতুল কদরের ফজিলত এবং নবীজির সুন্নত অনুসরণের মাধ্যমে হৃদয়ে তাকওয়ার গুণ জাগ্রত করার বিশেষ সুযোগ। ইতিকাফকারী পরিবার-পরিজন ও দুনিয়াবি ব্যস্ততা ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ধ্যান-খেয়ালে নিমগ্ন থাকেন।
রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করলে নিশ্চিতভাবে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত (লাইলাতুল কদর) পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা তাকওয়ার স্তর বৃদ্ধিতে সহায়ক। নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরতের পর থেকে প্রতি বছর রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, নফল নামাজ, তালিম তাওবাহ-ইস্তিগফার এবং ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় মগ্ন থাকতে হয়। ইতিকাফ অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, মোবাইলে ফোনালাপ, কেনাকাটা বা দুনিয়াবি চিন্তা পরিহার করতে হয়। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইন্তেকাল পর্যন্ত প্রতি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। সংক্ষেপে, ইতিকাফ হলো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ঘরে বসে নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করার এবং তাকওয়া অর্জনের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ। রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধানে ইতিকাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহর নবী (স.)বলেছেন, যে ব্যক্তি ইতিকাফ করেন সে সমস্ত গোনাহ থেকে মুক্ত থাকেন এবং সমস্ত নেককাজের সওয়াব (যা সে ইতিকাফের কারণে করতে পারেনি) তার আমলনামায় দেয়া হয়। (জামে তিরমিজি) নবীজি (সা.) বলেন, তোমরা রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রীতে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান করো। (সহিহ্ বুখারি শরিফ)
ঢাকার মুগদা উত্তর মা-া বাইতুন নূর জামে মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মুফতি ফয়জুল্লাহ জীবনপুরী জুমার বয়ানে বলেন, ‘আদর্শ জীবন গড়তে হলে গুনাহ মুক্ত জীবন গড়তে হবে।’ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেনÑ ‘তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের গুনাহ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় যারা পাপ করে আখিরাতে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে। (সূরা আনআম ১০ নাম্বার আয়াত) সুতরাং কোনো গুনাহকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেইÑ চাই তা প্রকাশ হোক অপ্রকাশ্য হোক, হাতেগোনা কিছু গুনাহ বর্জন করে অবশিষ্ট গুনাহগুলো করতে থাকা তওবার জন্য যথেষ্ট নয়। গুনাহমুক্ত জীবন কাটাতে চাইলে ছোট-বড় সব গুনাহই বর্জন করতে হবে। তিন জিনিস ছোট হলেও বড় মনে করাÑ এক আগুন, দুই গুনাহ, তিন রোগ। শুধু নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচাইলে হবে না। নিজের পরিবার পরিজনকেও গুনাহ থেকে বাঁচাতে হবে, কেউ যদি ভাবে আমি গুনাহ করব না, আমার স্ত্রী-সন্তান করুক তাতে আমার কী আসে-যায়। মনে রাখবেন, এভাবে কখনো নিজেকে মুক্ত রাখা যায় না। নিজেকে গুনাহ থেকে পবিত্র তখনই রাখতে পারবে, যখন নিজের পরিবেশকে নিজের স্ত্রী-সন্তানকে গুনাহ থেকে মুক্ত করে তুলতে সক্ষম হবে। নিজে সংশোধন প্রত্যাশী আর স্ত্রী যদি হয় গুনাহের পথচারী তাহলে এই স্ত্রী একসময় তোমাকে গুনাহে ডুবিয়ে মারবে। এ জন্যই নিজেকে গুনাহ মুক্ত রাখা যতটা প্রয়োজন, স্ত্রী সন্তানদেরকে ও গুনাহমুক্ত করে তোলা ঠিক ততটা প্রয়োজন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেনÑ ‘হে ঈমানদারগণ তোমরা নিজেকে অথবা পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।’ (সূরা তাহরিম) আল্লাহ আমাদের সবাইকে গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন।

