spot_img

পরকালের পাঁচ প্রশ্ন: মানবজীবনের চূড়ান্ত হিসাব

অবশ্যই পরুন

মানবজীবন উদ্দেশ্যহীন নয়, অনিয়ন্ত্রিতও নয়। ইসলাম মানুষের জীবনকে একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য, দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার কাঠামোর ভেতরে আবদ্ধ করেছে। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যে পরকালের অনন্ত জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। একটি হাদিসে পরকালে পাঁচ প্রশ্নের প্রসঙ্গ এসেছে, যা মানবজীবনের মৌলিক কর্মকাণ্ডের হিসাব। আবু বারজা আল আসলামি (রা.) বলেন—রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার দুই পা তার স্থান থেকে সরবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে— এক. সে তার জীবন কী কাজে শেষ করেছে, দুই. সে তার জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে, তিন. সে তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে, চার. সে তার সম্পদ কোন খাতে ব্যয় করেছে, পাঁচ. সে তার শরীর কোন কাজে ক্ষয় করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭, মুসনাদ দারেমি, হাদিস : ৫৩৬)

এক. জীবনকাল—সময়ের হিসাব
প্রথম প্রশ্নটি হবে মানুষের জীবনকাল সম্পর্কে—কী কাজে তা ব্যয় করা হয়েছে। সময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত। অর্থ হারালে তা আবার অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু হারানো সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই কোরআনে আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করেছেন—সুরা আসর, সুরা ফজর, সুরা দোহা ইত্যাদি তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
মানুষ তার সময় কীভাবে ব্যয় করেছে—ইবাদতে, নেক আমলে, জ্ঞানার্জনে ও মানবকল্যাণে; নাকি অলসতা, গুনাহ, অপচয় ও আত্মবিস্মৃতিতে—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সময়কে যারা তুচ্ছ মনে করে, এই প্রশ্ন তাদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ হবে। মুমিনের জীবন তাই সময় সচেতন, লক্ষ্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।

দুই. ইলম—জ্ঞানের দায়বদ্ধতা
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হবে মানুষের অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে—সে সম্পর্কে। ইসলাম অজ্ঞতার ধর্ম নয়; বরং ‘ইকরা’ দিয়ে যার যাত্রা শুরু, কিন্তু ইসলামে জ্ঞান শুধু তথ্য নয়; বরং আমলের প্রেরণা। যে ব্যক্তি সত্য জেনেও তা অনুযায়ী চলেনি, তার জ্ঞানই পরকালে তার বিরম্নদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
আলেম যদি আমল না করেন, বক্তা যদি নিজের কথার বিপরীতে চলেন, শিক্ষিত ব্যক্তি যদি নৈতিকতা বিসর্জন দেন—তাহলে সেই জ্ঞান তার জন্য নিয়ামত নয়; বরং শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ইলম অর্জনের পাশাপাশি ইখলাস, আমল ও তাকওয়ার সংযোগ অপরিহার্য।

তিন. সম্পদ—উপার্জনের উত্স
তৃতীয় প্রশ্নটি হবে মানুষের সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে—সে বিষয়ে। হালাল-হারামের সীমারেখা ইসলামে অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রতারণা, সুদ, ঘুষ, জুলুম, অবৈধ ব্যবসা কিংবা অন্যের অধিকার হরণ করে অর্জিত সম্পদ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
দুনিয়াতে মানুষ হয়তো অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে প্রভাব, ক্ষমতা ও স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন করতে পারে, কিন্তু পরকালে এই প্রশ্নের সামনে সে নিরম্নপায় হয়ে পড়বে। কারণ আল্লাহ তাআলা শুধু পরিমাণ নয়; বরং উত্সও বিচার করবেন।

চার. সম্পদ—ব্যয়ের খাত
চতুর্থ প্রশ্নটি হবে—উপার্জিত সম্পদ কোথায় ব্যয় করা হয়েছে। শুধু হালাল উপার্জনই যথেষ্ট নয়; বরং সেই সম্পদের ব্যবহারও হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক। অপচয়, বিলাসিতা, অহংকার, হারাম কাজে অর্থ ব্যয়—এসবের জন্যও জবাবদিহি করতে হবে।
অন্যদিকে আল্লাহর পথে দান, গরিব-দুখীর সাহায্য, পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব পালন, দ্বিনি কাজে সহযোগিতা—এসব ব্যয় পরকালে নাজাতের মাধ্যম হবে। কিয়ামতের দিন অর্থ নিজে কথা বলবে—কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় ব্যয় হয়েছে।

পাঁচ. দেহ—শক্তির ব্যবহার
পঞ্চম ও শেষ প্রশ্নটি হবে মানুষের দেহ বা শরীর কী কাজে ক্ষয় করেছে—সে সম্পর্কে। যৌবন, শক্তি, সুস্থতা—সবই আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই দেহ দিয়ে কেউ ইবাদত করেছে, কেউ মানুষের উপকার করেছে, আবার কেউ গুনাহ, জুলুম ও নাফরমানিতে নিজেকে লিপ্ত করেছে।
চোখ কী দেখেছে, কান কী শুনেছে, জিহ্বা কী বলেছে, হাত-পা কোথায় চলেছে—সব কিছুর হিসাব দিতে হবে। কুরআন বলছে, সেদিন মানুষের নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গই তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

মানবজীবনের পূর্ণ নকশা
পরকালের এই পাঁচ প্রশ্ন আসলে মানবজীবনের পূর্ণ নকশা। জীবন, জ্ঞান, সম্পদ ও শরীর—সবকিছুই পরীক্ষা। এই হাদিস আমাদের উদাসীন জীবন থেকে সচেতন জীবনের দিকে আহ্বান জানায়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত—পরকালের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর প্রস্তুতি হওয়া উচিত।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর।

সর্বশেষ সংবাদ

ইরানের সঙ্গে চমৎকার আলোচনা হয়েছে: ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে চমৎকার আলোচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাস্কাটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ