ইরানের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র—এমন আলোচনা চলছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে। চলতি সপ্তাহেই এই হামলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সময় পরিবর্তিত হতে পারে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য হামলার পর ইরানের প্রতিশোধ এবং এর আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে মতভেদ রয়েছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের সূত্র অনুযায়ী, ইরানে টানা এক মাস ধরে চলমান বিক্ষোভ এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগকে সামনে রেখে এই হামলার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছে ওয়াশিংটন। অভিযোগ রয়েছে, এসব দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানালেও পরবর্তীতে উত্তেজনা কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক চাপেই ট্রাম্প এই অবস্থান নেন বলে জানা গেছে।
তবে কিছু প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ইতি টানার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কেবল একটি সাময়িক বিরতি। তাঁদের মতে, তেহরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা থেকে এখনো সরে আসেননি ট্রাম্প।
মিডল ইস্ট আই আরও জানায়, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল নিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেখানে সাময়িক বিরতির পর অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয় বলে দাবি করা হয়। এক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান ইস্যুতেও একই কৌশল অনুসরণ করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জানুয়ারির শুরুতে যে অবস্থান ছিল, তার তুলনায় বর্তমানে ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি সামরিকভাবে প্রস্তুত। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়েছে এবং এই প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এতে এফ-৩৫, এফএ-১৮ যুদ্ধবিমান এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন অবস্থান নিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলার অনুমতি দেয়নি। এই নিষেধাজ্ঞা এপ্রিল ২০২৫ থেকে কার্যকর রয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, এক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, আরব দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা হলে সেসব দেশকেও পাল্টা হামলার মুখে পড়তে হবে।
সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও তুরস্ক প্রকাশ্যে ইরানে হামলার বিরোধিতা করেছে। তবে ইসরায়েলি গণমাধ্যম দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান হামলার পক্ষে রয়েছে। যদিও সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানায়, তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে ব্যবহার করতে দেবে না।
এর আগে জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে ইরান কাতারের আল-উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। তবে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলায় নতুন কোনো মার্কিন হামলাকে দেশটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে ইরান আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে—যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা বা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও থাকতে পারে।
এর আগে ১২ দিনের ইরান–ইসরায়েল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশে আধিপত্য বজায় রাখলেও ইরান তেলআবিব ও হাইফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হলেও কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
ওই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের কাছে থাড ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার অনুরোধ জানালেও রিয়াদ তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে।

