পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি আর এই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পিতা। সন্তানের ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও জীবনবোধ গঠনে পিতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। কোরআন-সুন্নাহে মাতা-পিতার দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, বিশেষত সন্তানের লালন-পালন, শিক্ষা, নৈতিক উন্নয়ন ও পারিবারিক কল্যাণের বিষয়ে। নবী ও রাসুলদের জীবনী ইসলামী আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন।
তাঁদের পারিবারিক আচরণ ও সন্তান প্রতিপালনের পদ্ধতি মুসলিম সমাজের জন্য অনুসরণযোগ্য আদর্শ। এই প্রেক্ষাপটে ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর জীবনঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এক দীর্ঘ হাদিসে ইবরাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে একজন পিতার দায়িত্ব, দূরে থেকেও সন্তানের খোঁজখবর নেওয়ার কৌশল, পারিবারিক জীবনে হিকমতপূর্ণ হস্তক্ষেপ এবং ঈমানি ও নৈতিক মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে। হাদিসটি হলো ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবরাহিম (আ.) ইসমাঈলের মা (হাজেরা) ও তাঁর দুধের শিশু ইসমাঈলকে সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরের নিকট এবং জমজমের ওপরে একটি বড় গাছের নিচে (বর্তমান) মসজিদের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় তাঁদের রাখলেন।
তখন মক্কায় না ছিল জনমানব, না ছিল কোনো পানি। সুতরাং সেখানেই তাঁদের রেখে গেলেন এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে স্বল্প পরিমাণ পানি দিয়ে গেলেন। তারপর ইবরাহিম (আ.) ফিরে যেতে লাগলেন।…ইসমাঈল (আ.)-এর বিয়ের পর ইবরাহিম (আ.) তাঁর রেখে যাওয়া পরিজনকে দেখার জন্য এখানে এলেন।
কিন্তু এসে ইসমাঈলকে পেলেন না। পরে তাঁর স্ত্রীর কাছে তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলেন। স্ত্রী বলেন, ‘তিনি আমাদের রুজির সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন।’ আবার তিনি পুত্রবধূর কাছে তাঁদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বধূ বললেন, ‘আমরা অতিশয় দুর্দশা, দুরবস্থা, টানাটানি এবং ভীষণ কষ্টের মধ্যে আছি।
’ তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে নানা অভিযোগ করলেন। তিনি তাঁর পুত্রবধূকে বললেন, ‘তোমার স্বামী বাড়ি এলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলে নেয়।’ এই বলে তিনি চলে গেলেন। ইসমাঈল যখন বাড়ি ফিরে এলেন, তখন তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর আগমন সম্পর্কে একটা কিছু ইঙ্গিত পেয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কাছে কেউ কি এসেছিলেন?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, এই এই আকৃতির একজন বয়স্ক লোক এসেছিলেন। আপনার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তাঁকে আপনার খবর দিলাম। আবার আমাকে আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমি তাঁকে জানালাম যে আমরা খুবই দুঃখ-কষ্ট ও অভাবে আছি।’ ইসমাঈল বললেন, ‘তিনি তোমাকে কোনো কিছু অসিয়ত করে গেছেন কী?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আপনাকে তাঁর সালাম পৌঁছাতে এবং আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলেন।’ ইসমাঈল (আ.) বললেন, ‘তিনি ছিলেন আমার পিতা এবং তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, যেন তোমাকে আমি তালাক দিয়ে দিই। কাজেই তুমি তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও।’ সুতরাং ইসমাঈল (আ.) তাঁকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ‘জুরহুম’ গোত্রের অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। অতঃপর যত দিন আল্লাহ চাইলেন ইবরাহিম (আ.) তত দিন তাঁদের থেকে দূরে থাকলেন। পরে আবার দেখতে এলেন। কিন্তু ইসমাঈল (আ.) সেদিনও বাড়িতে ছিলেন না। তিনি পুত্রবধূর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং ইসমাঈল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। স্ত্রী জানালেন, তিনি আমাদের খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন। ইবরাহিম (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কেমন আছ?’ তিনি তাঁর কাছে তাঁদের জীবনযাত্রা ও সাংসারিক অবস্থা সম্পর্কেও জানতে চাইলেন? পুত্রবধূ জবাবে বলেন, ‘আমরা ভালো অবস্থায় এবং সচ্ছলতার মধ্যে আছি।’ এ বলে তিনি আল্লাহর প্রশংসাও করলেন। ইবরাহিম (আ.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের প্রধান খাদ্য কী?’ পুত্রবধূ জবাবে বলেন, ‘মাংস’। এর পর বলেন, ‘তোমাদের পানীয় কী?’ বধূ বলেন, ‘পানি’। ইবরাহিম (আ.) দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! এদের মাংস ও পানিতে বরকত দাও।’…আলাপ শেষে ইবরাহিম (আ.) পুত্রবধূকে বললেন, ‘তোমার স্বামীকে আমার সালাম বলবে এবং তাকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ বহাল রাখে।’…অতঃপর ইসমাঈল (আ.) যখন বাড়ি এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের কাছে কেউ এসেছিলেন কি?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, একজন সুন্দর আকৃতির বৃদ্ধ এসেছিলেন। (অতঃপর স্ত্রী তাঁর প্রশংসা করলেন এবং বললেন) তারপর তিনি আপনার সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আমি তখন তাঁকে আপনার খবর বললাম। অতঃপর তিনি আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি তাঁকে খবর দিলাম যে আমরা ভালোই আছি।’ স্বামী বললেন, ‘আর তিনি তোমাকে কোনো অসিয়ত করেছেন কী?’ স্ত্রী বলেন, ‘তিনি আপনাকে সালাম বলেছেন এবং আপনার দরজার চৌকাঠ অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশ দিয়ে গেছেন।’ ইসমাঈল (আ.) তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘তিনি আমার আব্বা, আর তুমি হলে চৌকাঠ। তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসেবে বহাল রাখি।’ (বুখারি, অধ্যায় : আম্বিয়া, অনুচ্ছেদ : ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর কথা, হাদিস : ২৭০৭)
হাদিসের আলোকে বলা যায়—
১. তাওয়াক্কুলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ : ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে হাজেরা (আ.) ও শিশু ইসমাঈল (আ.)-কে মক্কার জনমানবহীন স্থানে রেখে যান এবং খেজুর ও পানি দিয়ে যান। এতে বোঝা যায়, পিতার দায়িত্ব হলো—নিজের সাধ্যানুযায়ী ব্যবস্থা করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করা।
২. দূরে থেকেও সন্তানের খোঁজখবর নেওয়া : লেখাপড়া বা জীবিকার তাগিদে সন্তান দূরে অবস্থান করলে বা সন্তান বড় হলেও সন্তানের সার্বিক খোঁজখবর নিতে হবে। ইসমাঈল (আ.) প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত হওয়ার পরও ইবরাহিম (আ.) বারবার মক্কায় এসে সন্তানের অবস্থা দেখেছেন। পিতার দায়িত্ব শুধু শিশুকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, সন্তান বড় হলেও তার জীবনযাত্রা, ঈমান ও পরিবার সম্পর্কে সচেতন থাকা দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
৩. সন্তানের পারিবারিক জীবনের প্রতি নজর রাখা : ইবরাহিম (আ.) সরাসরি পুত্রবধূদের সঙ্গে কথা বলে সংসারের অবস্থা, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও অভিযোগপ্রবণতা পর্যবেক্ষণ করেন। পিতা সন্তানের দাম্পত্য জীবনের নৈতিক মান পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
৪. নৈতিক ও দ্বিনি মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত দেওয়া : ইসমাঈল (আ.)-এর প্রথম স্ত্রী ছিলেন অভিযোগকারী ও অকৃতজ্ঞ। দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন কৃতজ্ঞ ও আল্লাহর প্রশংসাকারী। ইবরাহিম (আ.) কোনো পার্থিব মানদণ্ডে নয়, বরং সবর, শোকর ও ঈমানি চরিত্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেন। এতে বোঝা যায়, পিতার দায়িত্ব হলো সন্তানের জীবনকে দ্বিনি মূল্যবোধে পরিচালিত করা।
৫. হিকমতের মাধ্যমে উপদেশ প্রদান : ইবরাহিম (আ.) সরাসরি বলেননি—‘তোমার স্ত্রীকে তালাক দাও, বরং বলেছেন, দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলো/বহাল রাখো।’ এভাবে পিতার উপদেশ হওয়া উচিত শালীন, দূরদর্শী ও হিকমতপূর্ণ। যাতে সন্তানের সম্মান ও স্বাধীনতাও বজায় থাকে।
৬. সন্তানের কল্যাণে দোয়া করা : ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেন—‘হে আল্লাহ! এদের মাংস ও পানিতে বরকত দাও।’ সন্তানের জন্য দোয়া করা পিতার অন্যতম মহান দায়িত্ব, যা সন্তান ও সমাজ উভয়ের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
৭. সন্তানের অনুপস্থিতিতেও খোঁজ নেওয়া : ইবরাহিম (আ.) ছেলে ইসমাঈল (আ.)-কে না পেলেও তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন। সন্তানের অবস্থা জানার জন্য পরিবার-পরিবেশ থেকেও তথ্য নেওয়া যায়।
৮. জীবিকা ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা : ইবরাহিম (আ.) প্রশ্ন করেছেন—‘তোমরা কেমন আছ? খাদ্য কী? পানীয় কী?’ পিতা সন্তানের হালাল রিজিক, জীবনযাত্রা ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য সম্পর্কে সচেতন থাকবেন।
৯. কৃতজ্ঞতা ও অভিযোগের ভাষা পর্যবেক্ষণ : একই প্রশ্নে ইসমাঈল (আ.)-এর দুই স্ত্রী দুই রকম জবাব দেন। একজন অভিযোগ করেন আর অন্যজন আল্লাহর প্রশংসা করেন। খোঁজ নেওয়ার সময় কথাবার্তার ভঙ্গি ও মানসিকতা লক্ষ করাও পিতার দায়িত্ব।
১০. প্রয়োজন ছাড়া গোপনীয়তা ভঙ্গ না করা : ইবরাহিম (আ.) সরাসরি ইসমাঈল (আ.)-এর কাছে স্ত্রীর দোষ বলেননি। পিতার খোঁজখবর নেওয়া হবে সংযম ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে এবং পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি না করে।
পরিশেষে বলা যায়, একজন পিতা হলেন সন্তানের ঈমান, চরিত্র, পরিবার ও ভবিষ্যতের নৈতিক অভিভাবক। পিতার দায়িত্ব শুধু ভরণ-পোষণ নয়, বরং দোয়া, দিকনির্দেশনা, তত্ত্বাবধান ও হিকমতপূর্ণ হস্তক্ষেপ। আর সন্তানের খোঁজখবর হবে—নিয়মিত, বিচক্ষণ, দ্বিনি মানদণ্ডে এবং সম্মান ও মমতার সঙ্গে। এটাই ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ, আর এ আদর্শই সব পিতার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ।
লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

