নতুন চিন্তাভাবনার কাঠামো ব্যবহার করে একটি নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় বেইজিংয়ে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ কথা বলেন। খবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তা তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎকার নেয়ার আগে আমি আপনার তিন শূন্য তত্ত্ব কিছুটা পড়েছি। এখন আমি আপনার কাছে জানতে চাই এ প্রস্তাবে তিন শূন্য তত্ত্ব এবং শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবিত আধুনিকীকরণ তত্ত্বের মধ্যে কোনও মিল আছে কিনা?
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অনেক সামঞ্জস্য আছে। বিষয়গুলো তো একই, তবে বিভিন্নভাবে বলা হচ্ছে। কিন্তু একই লক্ষ্যে আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। অর্থাৎ আমাদের লক্ষ্য এটাই যে, একটা নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করতে হবে। এই পুরনো পৃথিবী যতই আমরা টেনে হিঁচড়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করি না কেন, আমাদের পরিশ্রম এতে সার্থক হচ্ছে না। কাজেই মেরামতি কাজে না গিয়ে সুন্দর করে আবার কাঠামোটি গড়ে তুলতে হবে, এ ক্ষেত্রে চিন্তার কাঠামো গড়াই- ছিল তিন শূন্যের মূল কথা। পরিষ্কারভাবে বলা আমরা কি চাই।
এ সময় প্রশ্নকর্তা বলেন, এই তত্ত্ব বাস্তবায়িত হলে আমাদের পৃথিবী অনেক সুন্দর হবে।
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আমাদের পৃথিবীর সুন্দর হবে না কিন্তু বেঁচে যাবে। বর্তমান যে পৃথিবী, যে সভ্যতা কাঠামোতে আমরা আছি- এই কাঠামোতে পৃথিবীর বেঁচে থাকার কোন সুযোগ নেই। এটা একটি আত্মহননকারী একটা সভ্যতা। কাজেই আত্মহনন থেকে রক্ষা করে একটি সুন্দর সভ্যতার দিকে নিয়ে যেতে হলে বিশ্বকে প্রথমে এই অবস্থা থেকে সরিয়ে আনতে হবে।
প্রশ্নকর্তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে চীন সফর করার ফলে তার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার খুবই ভাল লাগছে। সবার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পুরনো বন্ধু-বান্ধব যারা আছেন, তাদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আমাদের বহু কাজ একসঙ্গে হচ্ছে, যেমন আমার বন্ধু প্রফেসর ড্যু বহুদিন থেকে এগুলো থেকে (গ্রামীণ ব্যাংক) উৎসাহ নিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠান চায়নিজ একাডেমি অব সোস্যাল সায়েন্সেস ওনার পরিচালনায় চলে। তিনি খুবই আগ্রহী হলেন এটা জানতে। বাংলাদেশে আসলেন এটা বোঝার জন্য। এরপর সারা চীনের বিভিন্ন জায়গায় তার এ কর্মসূচি প্রচার করেছেন। তার মাধ্যমে মাইক্রেক্রেডিট এসোসিয়েশন অব চায়না এরকম একটা বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। অনেকে এটার অনুকরণ করেছে, যার ফলে এসোসিয়েশন তৈরি হয়েছে। তারা বাৎসরিক সম্মেলন করে, নানা উৎসব করে। এগুলো আবার মনে পড়ে গেল ওনাকে দেখে।
তিনি বলেন, আরও অনেক বন্ধুবান্ধব যারা ছিলেন, তাদের সঙ্গে দেখা হলো এ উপলক্ষে। এই পরিবর্তনটা তার নজরে পড়েছে। আগে ছিলাম নিজের কাজ নিয়ে, এখন আবার কি সরকারের মধ্যে কি বিপদে পড়লাম তা বুঝতে চাচ্ছেন তারা। কি হবে? কেমন হবে? তবে সর্বাত্মকভাবে যেটা হলো- ভীষণ রকমের একটা সমর্থন পেলাম সবার কাছ থেকে। বিশেষ করে চীন সরকারের পক্ষ থেকে। তাদের সমর্থন একবারে সীমাহীন সমর্থন। কাজেই এটা আমাদেরকে একটা আনন্দ দেয়। এরকম পরিস্থিতিতে চীনের সমর্থন পাওয়া, সহযোগিতা পাওয়া খুবই দরকারি।
কারণ আমরা বড় রকমের সংস্কার করতে চাই। দেশকে নতুনভাবে গড়তে চাই। এখানে অনেক সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন আছে
প্রশ্নকর্তা বলেন, এ বছর চীন সফরে এসে যেই ভাষণ দিয়েছেন- তাতে চীনা দর্শক এবং অন্যান্য দেশের অতিথিদের কাছে কেমন সাড়া পেয়েছেন?
এর জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, খুবই ভালো, আমি যেগুলো বলতে চেয়েছি তাদের মনে দাগ কেটেছে বলে মনে হয়। কারণ উচ্চতর স্থানে আসীন এমন ব্যক্তি, উপ-প্রধানমন্ত্রী অনেক প্রশংসা করলেন। বিশেষ করে তিন শূন্যের কথাটা বললাম। আমি মনে করেছিলাম এগুলো বোধহয় উনি বুঝতে পারবেন না ৷
কিন্তু উনি এসে বললেন, ওনার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। বিশেষ করে তরুণদের মনের মধ্যে যে এটা ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছো এটা আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। আমার কাছে ভালো লেগেছে। আমি চিন্তা করে দেখব, কীভাবে এটাকে নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি।
তিনি বলেন, আমি বক্তৃতা দেওয়ার পর অনেকেই কথা বলতে এসেছিল। আমার পাশে যিনি বসেছিলেন, তিনি উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা করলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে যে- মানুষের মনে দাগ কাটতে পেরেছি এটা দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি৷
এ সময় প্রশ্নকর্তা অধ্যাপক ইউনূসের কাছে জানতে চান চীনের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের আলাপ আলোচনা কেমন হয়েছে।
জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, খুবই ভালো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি মনে করতে পেরেছেন যে তার সঙ্গে আমার ২০০৯ সালে দেখা হয়েছিল। তখন তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমি তারই আহ্বানে তার অফিসে সাক্ষাৎ করেছিলাম। সেখানে আমাদের মধ্যে মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে আলোচনা হয়েছিল সেটার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।
আলোচনা তার মনে দাগ কেটেছিল তিনি সেটাও বললেন। উনি ফুজিয়ান প্রভিন্স এর একজন গভর্নর ছিলেন। সেসময় তার বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তিনি সেসবের কথাও আমাকে বলেছেন এবং এই মাইক্রোক্রেডিট এর চিন্তা তার খুব মনে ধরেছে সেটাও তিনি উল্লেখ করেছেন। গভর্নর হিসেবে তার অভিজ্ঞতা, দারিদ্র মোচনে কি কি উপায় হতে পারে এবং তার মধ্যে এটাও (ক্ষুদ্রঋণ) একটি উপায় হিসেবে তিনি গ্রহণ করেছিলেন, সেজন্য সেটা তার খুব মনে ধরেছে বলে তিনি আমাকে জানিয়েছেন।
আমাদের আলোচনা খুবই সুন্দর হয়েছে। বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিতে আমরা কি কি করতে পারি সেটা তার কাছে আমরা তুলে ধরেছি, এ ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য সহযোগিতা ও সমর্থন লাগবে। তিনি সমর্থন দিতে আগ্রহী হয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, আপনাদের যা লাগে আমরা সেটা চেষ্টা করব আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চীনের সমাজবিজ্ঞান একাডেমির গ্রামীণ উন্নয়ন ইনিস্টিটিউটের গবেষক অধ্যাপক ড্যু, তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, আপনার চোখে আপনি কিভাবে প্রফেসর ইউনূসকে মূল্যায়ন করছেন?
প্রফেসর ড্যু বলেন, দারিদ্র নিয়ে গবেষণার সময় আমরা খেয়াল করেছি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে গ্রামীন ব্যাংকের একটি দল ১৯৭৬ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করেছে। ১৯৮৩ সালে তিনি গ্রামীন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, আর আমি দারিদ্র বিমোচন নিয়ে গবেষণা করি। আমি ভেবেছি আমরা কি তার অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারি? এ কারণে ১৯৯৩ সালে আমরা বাংলাদেশে যাই। তারপর থেকে ইউনূসের সাথে আমাদের সরাসরি যোগাযোগ শুরু। যদিও তিনি একজন অধ্যাপক তবে তিনি দরিদ্রদের বিশেষ করে তার দেশের দরিদ্র নারীদের নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন ।
প্রফেসর ড্যু বলেন, তিনি যে কেবল শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন তা নয়, বিশ্বজুড়ে থাকা দারিদ্র বিমোচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো কিন্তু তার ভূয়সী প্রশংসা করে। আপনি গ্রামাঞ্চলে গরিবদের জন্য যেভাবে ক্ষুদ্রঋণের সিস্টেম চালু করেছেন এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশের লোকেরা এটার উপকার পেয়েছেন।
এ অনুষ্ঠানে এসে অধ্যাপক ইউনূসের মধ্যে তিনি কোন পরিবর্তন দেখেছেন কিনা এ প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড্যু বলেন, তিনি এখনো আমার পুরনো বন্ধুর মতোই আছেন। দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্র থেকে তার দেশের রাষ্ট্রীয় নেতার পদে আছেন। তিনি আরও বৃহত্তর পরিসরে ভূমিকা পালন করছেন। তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এটা কোনও সহজ কাজ নয়। তিনি নিজের পরিচিত ক্ষেত্রে অতুলনীয় সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি এখন দেশের জন্য অপরিচিত ক্ষেত্রে নতুন পথ সুগমের কাজ করছেন, তাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি।
এ সময় তিনি পুরাতন কিছু ছবি দেখিয়ে বলেন, দেখুন- অধ্যাপক ইউনূস চিনের চিয়াংশু গ্রামে গিয়েছিলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। একটি ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী নারী তাকে সনদপত্রও দিয়েছেন।
এরপর তিনি বলেন যে, তিনি আশা করেন অধ্যাপক ইউনূস চীনেও বড় সাফল্য অর্জন করবেন।
এর জবাবে অধ্যাপক ইউনূস তাকে সহাস্যে বাংলাদেশে আসার উষ্ণ আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, আপনাকে বাংলাদেশে আসতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টাকে করা পরবর্তী প্রশ্নটি ছিলো এরকম- চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে অর্থনীতি ও বাণিজ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক্ষেত্রে আর কি কি অগ্রগতি করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
প্রধান উপদেষ্টা এর জবাবে বলেন, সব বিষয়ের অগ্রগতি হতে পারে। আজকের সভায় প্রাথমিক আলোচনা হল। তারা বাংলাদেশে আসবেন, আর নতুন ভাবে কি কি ক্ষেত্রে তৈরি করা যায় সেটা দেখবেন। সেই সঙ্গে বর্তমানে যেসব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সে সুযোগগুলো গ্রহণ করার জন্য তাদেরকে আহবান জানালাম। তারা সেসব সুযোগ গ্রহণের জন্য সাগ্রহে রাজি হয়েছেন। আমরা চীনে অনেক বন্ধু পেয়েছি। এ বন্ধুত্বকে আমরা কাজে লাগাবো যেন আবার নতুন ভাবে বাংলাদেশটা গড়ে তুলতে পারি।
এ সময় অধ্যাপক ইউনূসকে প্রশ্ন করা হয়, ২০২৫ সাল হলো চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। এ বছর উপলক্ষ্যে এ দুই দেশের সম্পর্ক গভীরতর করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কিনা।
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আমরা সব সময় চেষ্টা করব দুই দেশে সম্পর্ক গভীরতর হোক। এই উপলক্ষে আমরা আরো বেশি সচেষ্ট হবো এবং সে কারণেই এখানে আসা। চীনের সকল নেতা যারা আছেন তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করা। এটা আমরা করতে পেরেছি এবং আমরা মনে করি যে, আমাদের কথাগুলো তারা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং আমাদের কাজে তারা আমাদের সমর্থন করবেন।