spot_img

জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি সবারই জানা দরকার

অবশ্যই পরুন

যে কোনো মানুষই হঠাৎ অসুস্থ হতে পারে। হাসপাতালে যাওয়ার আগে তাৎকক্ষণিক চিকিৎসা কারও জীবন বাঁচানোর জন্য হয়ে উঠতে পারে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই খারাপ থেকে আরও খারাপ হওয়া বা চিকিৎসাসহায়তা না আসা পর্যন্ত সুস্থ রাখার জন্য প্রত্যেকের কিছুটা প্রাথমিক জ্ঞান থাকা ভালো।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে বলে কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সংক্ষেপে ‘সিপিআর’। কেউ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারালে, কারো হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেলে বা শ্বাস প্রশ্বাস চালু না থাকলে, সেই ব্যক্তিকে সিপিআর দিতে হয়। সিপিআরের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসে অক্সিজেন দেয়াসহ শরীরে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সঞ্চালন করতে থাকে। এর ফলে জীবন বাঁচানোও সম্ভব হয়।

তবে সিপিআরের সঠিক পদ্ধতি যেমন জানা দরকার, তেমনি কোন ক্ষেত্রে সিপিআর দেয়া যেতে পারে সেটাও জেনে রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সাধারণ মানুষেরও  সিপিআর প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা উচিত। যা বিশ্বের অনেক দেশে ছোট থেকেই ট্রেনিং দেয়ানো হয়।

সিপিআর কখন দিতে হবে
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে বলা আছে, ‘আপনার সামনে যদি কারো কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়, তাহলে দ্রুত ৯৯৯-এ ফোন করুন এবং সিপিআর দেয়া শুরু করুন।’

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ বলছে, ‘যদি কেউ অজ্ঞান হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস না নেয় তাহলে ৯৯৯-এ ফোন করতে হবে এবং সিপিআর দেয়া শুরু করতে হবে।’

আমেরিকান রেড ক্রসের ভাষ্য অনুযায়ী, যখন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয় অথবা হার্টবিট নিয়মিত না হয়, তখন মস্তিষ্কে ও অন্যান্য জরুরি প্রত্যঙ্গে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে না। ফলে তা মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলে, যার কারণে অনেক সময় ব্যক্তি মারাও যেতে পারে। কিন্তু সিপিআর দিলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আশরাফ উর রহমান তমাল বলেন, ‘কার্ডিয়াক পেশেন্টেরও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে, আবার যাদের কোনো হৃদরোগ নেই তাদেরও হতে পারে। এক্ষেত্রে কেউ জোরে আঘাত পেলে বা পড়ে গেলে, যদি দেখা যায় যে তার হার্ট বন্ধ হয়ে আসছে, তিনি মাটিতে শুয়ে পড়ছেন, তখন সিপিআর শুরু করলে তাকে বাঁচানোর সময় পাওয়া যায়।’

তিনি আরও বলেন, হার্ট বন্ধ হলে খুব অল্প সময় দেয়, ৫-৭ মিনিট, এরপর যদি হার্ট ফিরেও আসে পেশেন্টের ব্রেইন ডেথ হয়ে যায়। এ কারণেই সিপিআর দ্রুত একেবারে প্রথম অবস্থাতেই শুরু করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

চিকিৎসকরা বলছেন, হৃদরোগ ছাড়াও ইলেকট্রিক শক, জোরে আঘাত, পানিতে ডুবে, শরীরে বড় ধরনের ইনফেকশন থাকা, এমন নানা কারণেই হৃদযন্ত্র কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আর এমন সময় গুলোতেই জরুরি ভিত্তিতে সিপিআর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সিপিআরের সাতটি ধাপ

রেড ক্রস সিপিআরের সাতটি ধাপের কথা বলেছে। যেখানে প্রথম ধাপেই নিরাপত্তার দিকটা দেখতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশে আগুন বা পানির মতো কোন বিপদ আছে কি না, তিনি রাস্তার মাঝখানে কি না ইত্যাদি বিষয়। প্রয়োজনে পিপিই বা পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে দেখতে হবে ব্যক্তিটি কোনো সাড়া দেয় কি না। এজন্য তাকে ধাক্কা দিয়ে জোরে জোরে ডাকতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত হতে হবে যে কোনো রক্তক্ষরণ হচ্ছে না। যদি লোকটির কোনো সাড়া না পাওয়া না যায় এবং সে যদি নিঃশ্বাস না নেয়, তার পালস না থাকে অথবা যদি ঘড়ঘড় করে, তাহলে এই পর্যায়ে তৃতীয় ধাপে এসে সাহায্যের জন্য ডাকতে হবে ও ইমার্জেন্সি বা জরুরি পরিষেবার নম্বর কল করতে হবে।

চতুর্থ ধাপে হাঁটু গেড়ে ওই ব্যক্তির পাশে বসতে হবে। এ সময় হাত কাঁধ বরাবর সামনে থাকবে, আর ওই ব্যক্তিকে সমতল জায়গায় চিৎ করে শুইয়ে দিতে হবে।

পঞ্চম ধাপে এসে ওই ব্যক্তির বুকের উপর দুটো হাত প্রতিস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে এক হাতের উপর আরেক হাত রেখে দুই হাতের আঙুলগুলো ধরে তালু দিয়ে চাপ দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন চাপটি অন্তত দুই ইঞ্চি গভীরে যায়। প্রতিবার চাপ দিয়ে ছেড়ে দিতে হবে যাতে বুক আবার আগের অবস্থানে চলে আসে। এর গতি থাকবে মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার।

তবে টানা ৩০ বার এরকম চাপ দেয়ার পর একটা বিরতি নিতে হবে। তখন আসবে ষষ্ঠ ধাপ অর্থাৎ মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস দেয়া। এজন্য মাথা সোজা রেখে থুতনিতে চাপ দিয়ে উপরে ঠেলে দিতে হবে, এরপর মুখটা হা করতে হবে। তারপর ওই ব্যক্তির নাক ধরে একটা স্বাভাবিক দম নিয়ে তার মুখে পুরো মুখ চেপে শ্বাস দিতে হবে।

এর স্থায়িত্ব হবে এক সেকেন্ড এবং খেয়াল রাখতে হবে যাতে বুকটা একটা ফুলে উঠে। এরপর পরের শ্বাস দেবার আগে মুখ উঠিয়ে সেটি বের হয়ে যাবার সুযোগ করে দিতে হবে।

কিন্তু এক্ষেত্রে যদি প্রথমবারে বুকের উঠানামা না হয়, তাহলে মাথাটা আবার নাড়িয়ে নিয়ে মুখটা খুলে দেখে নিতে হবে যে গলায় বা মুখের ভেতরে কিছু আটকে আছে কি না, যা নিঃশ্বাসের ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে।

৭ম ধাপে বলা হয়েছে আবারও এরকম ৩০ বার বুকে চাপ দেয়া চালিয়ে যেতে হবে। এবং আবার মুখে দুবার নিঃশ্বাস দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে বুকে চাপ দেয়ার বিরতি যেন ১০ সেকেন্ডের বেশি না হয়। এভাবে অ্যাম্বুলেন্স বা কোনো সাহায্য না আসা পর্যন্ত সিপিআর চালিয়ে যেতে হবে।

শিশুদের সিপিআর

অনেক সময় ছোট বাচ্চাদেরও সিপিআর দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। তবে শিশুদের সিপিআরের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা মেনে চলার কথা বলছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা।

প্রথমে কপালে এক হাত রেখে মাথাটা পেছনের দিকে নিয়ে থুতনিটা উঁচু করতে হবে। মুখ বা নাকে কোনো কিছু আটকে থাকলে সেটা সরিয়ে দিতে হবে।

এরপর নাক ধরে মুখ থেকে মুখে পাঁচবার নিঃশ্বাস দেয়ার কথা বলা হয়েছে, একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে বুকের উঠানামার দিকে। এরপর এক হাতের তালু শিশুটির বুকের উপর বসাতে হবে এবং ৫ সেন্টিমিটার (প্রায় দুই ইঞ্চি) পর্যন্ত চাপ দিতে হবে।

তবে এক বছরের নিচের শিশুর ক্ষেত্রে দুই হাতের বদলে দুটি আঙুল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে চাপের গভীরতা হবে ৪ সেন্টিমিটার বা দেড় ইঞ্চি। একইভাবে বড়দের মতোই মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার চাপ দেয়ার গতিতে, ৩০ বার পরপর দুবার করে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস দিতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রেও কোনো সাহায্য না আসা পর্যন্ত এভাবে সিপিআর চালিয়ে যেতে হবে।

জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসহায়তার প্রয়োজনে অনেক মানুষ মারা যাওয়ার কারণ প্রাথমিক চিকিৎসার অভাব। প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান নিজের জন্য যেমন তেমনি  আশপাশের মানুষের জন্যও মূল্যবান। সহায়তা না আসা পর্যন্ত দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে পড়লে আহত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে নিজেকে সক্ষম করে তুলবে প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

সর্বশেষ সংবাদ

১৫ বছর পর ধর্ষণ মামলার রায়, ৬ জনের ১৪ বছর করে কারাদণ্ড

নাটোরের বড়াইগ্রামে ৮ম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ ও অপহরণ মামলায় ৬ জনের ১৪ বছর করে কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ২০ হাজার...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ