spot_img

এতেকাফের হাকিকত ও ফজিলত

অবশ্যই পরুন

এতেকাফের শাব্দিক অর্থ

اِعْتِكَاف অর্থ কোন জিনিস আঁকড়ে ধরা ও তার অভিমুখী হওয়া। মসজিদে সওয়াবের নিয়তে অবস্থান করা।

اِعْتِكَاف (এতেকাফ)-এর শাব্দিক অর্থ: অবস্থান করা, কোন বস্তুর উপর স্থায়ীভাবে থাকা। এ শব্দটি সকর্মক ক্রিয়া হলে সোলাসী মুজাররাদ থেকে তার মাসদার হয় العَكْفُ, আর অকর্মক ক্রিয়া হলে হয় اَلْعُكُوْفُ। সকর্মক ক্রিয়া হলে অর্থ হয় اَلْحَبْسُ ও اَلْمَنْعُ, অর্থাৎ আটকিয়ে রাখা ও বাধা প্রদান করা। এ অর্থেই কুরআন শরীফে ব্যবহৃত হয়েছে,

وَصَدُّوْكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَالْهَدْیَ مَعْكُوْفًا اَنْ یَّبْلُغَ مَحِلَّهٗ. (الفتح: ২৫)

‘এবং তারা নিবৃত্ত করেছিল তোমাদেরকে মসজিদুল হারাম থেকে ও বাধা দিয়েছিল কুরবানীর জন্য আবদ্ধ পশুগুলোকে যথাস্থানে পৌঁছুতে।’ (সূরা আল-ফাতহ: ২৫)

এ আয়াতে বলা হল, কাফেরগণ ষষ্ঠ হিজরীতে হোদায়বিয়া নামক স্থানে মুসলমানের কুরবানীর পশুগুলোকে হরম অঞ্চলে পৌঁছুতে বাধা দেয়। এ অর্থেই এতেকাফ শব্দ ব্যবহৃত হয়। কেননা, এতেকাফের মধ্যেও নিজের সত্তা আল্লাহর এবাদতে আটকিয়ে রাখা হয় এবং নিজেকে মসজিদ থেকে বের হওয়া ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়।

আর অকর্মক ক্রিয়া হলে অর্থ হয়, কোন বস্তুর নিকট স্থায়ীভাবে আসা। এ অর্থেই পবিত্র কুরআন মজীদে ব্যবহৃত হয়েছে,

فَاَتَوْا عَلٰی قَوْمٍ یَّعْكُفُوْنَ عَلٰۤی اَصْنَامٍ لَّهُمْ .

‘অতঃপর তারা প্রতিমা পূজায় রত এক জাতির নিকট উপস্থিত হয়।’ (সূরা আরাফ: ১৩৮)

এতেকাফ অর্থ কোন বস্তু আঁকড়ে ধরা, কোন বস্তুর উপর স্থায়ীভাবে থাকা, সে বস্তু ভাল হোক বা মন্দ। এ অর্থেই কুরআন মজীদে ব্যবহৃত হয়েছে,

وَلَا تُبَاشِرُوْهُنَّ وَاَنْتُمْ عٰكِفُوْنَ فِی الْمَسٰجِدِ.

‘তোমরা মসজিদে এতেকাফরত অবস্থায় তাদের সাথে সঙ্গত হয়ো না।’ (সূরা বাক্বারা: ১৮৭)

আল্লাহ তাআলা অন্য এক জায়গায় এরশাদ করেছেন,

مَا هٰذِهِ التَّمَاثِیْلُ الَّتِیْۤ اَنْتُمْ لَهَا عٰكِفُوْنَ

‘এই মূর্তিগুলি কী, যাদের পূজায় তোমরা রত রয়েছ!’ (সূরা আম্বিয়া: ৫২)

শরঈ অর্থ

শরীয়তের পরিভাষায় এতেকাফ বলা হয়, এতেকাফের নিয়তে পুরুষের ঐ মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে নির্ধারিত ইমাম ও মুআযযিন আছে এবং পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করা হয়; অথবা কোন মহিলার স্বীয় ঘরের সালাতের স্থানে অবস্থান করা।

এতেকাফের লক্ষ্য

এতেকাফের লক্ষ্য হল, প্রভুর ধ্যানের মাধ্যমে হৃদয় পরিচ্ছন্ন করা, শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে এবাদতে যুক্ত করা, নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া। আর আল্লাহর অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল হয়ে তাঁর ঘরে তাঁর এবাদতে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা। আল্লাহর রহমত লাভের আশায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা এবং তাঁর দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করা। যেখানে আল্লাহর রহমতের কারণে কোন দুশমন অনিষ্ট সাধনের জন্য পৌঁছুতে পারবে না।

এতেকাফ যদি এখলাস ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে হয় তবে এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল এবং আল্লাহ তাআলার অত্যন্ত প্রিয় আমল। এতেকাফের সঙ্গে যদি রোযাও মিলিত হয় তখন মুমিন আল্লাহর আরও নিকটে চলে যায়।

এতেকাফের উদ্দেশ্য

এতেকাফের উদ্দেশ্য হল, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেকে নিভৃতে একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর সান্নিধ্যে আটকিয়ে রাখা। সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এক আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করা। যেন আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর কাছে উপস্থিতিই হৃদয়ের একমাত্র ধ্যান হয় এবং গায়রুল্লাহর ভালবাসার পরিবর্তে আল্লাহর ভালবাসা, নৈকট্য ও সন্তুষ্টিই হৃদয়ের একমাত্র চিন্তা হয়। ফলে এ ভালবাসা কবরের নিসঙ্গতায় কাজে দিবে। যে সময় আল্লাহ ছাড়া আর কোন সঙ্গী বা প্রশান্তি দানকারী আর কেউ থাকবে না।

এতেকাফের হাকীকত

সর্বদিক থেকে পৃথক হয়ে, সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শুধু আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক করা। দুনিয়ার সব ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে শুধু এক আল্লাহর এবাদতে এবং তাঁর যিকির ও ফিকিরে লেগে যাওয়া। এতেকাফের এ উদ্দেশ্যে সফল হতে হলে কিছু বাধ্যবাধকতা অপরিহার্য। তাহলে গভীর মনোনিবেশসহ এবাদত হবে, নিজের নফসের বিরুদ্ধে চাপ পড়বে, এভাবে পরিবর্তন আসবে এবং উদ্দেশ্য হাসিল হবে।

এতেকাফের হেকমত

সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সকলের কাছ থেকে পৃথক হয়ে নিজের মালিকের একান্ত সান্নিধ্যে পড়ার দ্বারা হৃদয়ে একাগ্রতা সৃষ্টি হয়। এর ফলে আত্মা পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হয় এবং এবাদতে একনিষ্ঠতা অর্জিত হয়। এতেকাফ ফেরেশতাদের সঙ্গে সাদৃশ্য সৃষ্টি করার এক অতি উত্তম পন্থা।

রমযানের শেষ দশকে এতেকাফের হেকমত

এতেকাফের অর্থ বাধা দেওয়া ও আটকিয়ে রাখা। এতেকাফকারী ব্যক্তি সিয়াম সাধনা করে ব্যক্তিগত ও জাগতিক প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর এবাদতের উদ্দেশ্যে নিজেকে মসজিদে আটকিয়ে রাখে এবং আল্লাহর দরজায় নিবেদন করে। এ জন্য এ আমলের নাম এতেকাফ। এ আমল সুন্নাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর শেষ দশকে এতেকাফে বসতেন।

অতএব এতেকাফ হল, প্রেমাস্পদের দরজায় প্রেমিকের হৃদয়-মথিত হাহাকার ও কান্না পেশ করা। এতেকাফ আদায়কারী নিজেকে আল্লাহর দরবারে সর্বতোভাবে আবদ্ধ করে, যেন একজন সকাতর  ভিক্ষুক কারো দরজায় বসে পড়ে এবং প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সে দরজায় অবিচল থাকে। অথবা একজন খাঁটি প্রেমিক যে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত অবস্থায় জগতের সকল প্রয়োজন উপেক্ষা করে প্রেমাস্পদের দর্শন লাভের প্রত্যাশায় তার দরজায় আসন গেড়ে বসে পড়ে। প্রেমাস্পদ যতক্ষণ মুখ না দেখায়, ততক্ষণ এ দুয়ার থেকে সে সরে না। এ অন্ধ প্রেমিক সকল আনন্দ ও ভোগবিলাসিতা দুই পায়ে মাড়িয়ে প্রেমাস্পদের দরজায় মাথা রেখে দেয়।

এ জন্য এতেকাফ বৈধ শুধু আল্লাহর ঘরে। আর নারীদের ক্ষেত্রে ওযরের কারণে নিজের ঘরের নামাযের জায়গায়। এ কারণেই এতেকাফকারীর জন্য রাতেও স্ত্রী গমন বৈধ নয়। এমনকি, তাকে কামভাব নিয়ে স্পর্শ করাও অবৈধ। কেননা খাঁটি প্রেমিকের জন্য ভিন্ন দিকে খেয়াল দেওয়ারও অবকাশ নেই। রমযানের শেষ দশকে যে লাইলাতুল কদরের প্রকাশ ঘটে, তা এমন নূরের ঝলক, যা প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের প্রেমিকের উপরই বিকশিত হয়।

এতেকাফের স্থান

এতেকাফের সর্বোত্তম স্থান মসজিদুল হারাম, অতঃপর মসজিদে নববী সালল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অতঃপর মসজিদে আকসা।এরপর ঐ জুমআর মসজিদ, যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করা হয়। যে মসজিদে জুমআর সালাত আদায় করা হয়, চাই সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করা হোক বা না হোক। সে মসজিদে এতেকাফ সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই।

ইলমে ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হেদায়া’য় রয়েছে, ইমাম আবু হানীফা রহ. থেকে বর্ণিত আছে, এতেকাফ সহীহ হতে হলে কমপক্ষে এই রকম মসজিদ হতে হবে, যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করা হয়। কারণ এতেকাফ সালাতের জন্য অপেক্ষার এবাদত। অতএব এ এবাদত এমন স্থানের সঙ্গেই নির্দিষ্ট হবে যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করা হয়।

খারেযেমী হেদায়ার টীকাগ্রন্থ ‘কেফায়া’য় এ কথার ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘ইমাম আবু হানীফা রহ. এ বক্তব্যে জুমআর মসজিদ ব্যতীত অন্য মসজিদের কথা বুঝিয়েছেন। কারণ যেখানে জুমআর সালাত আদায় করা হয় সেখানে অবশ্যই এতেকাফ সহীহ হয়, যদিও সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় হয় না।’ অতঃপর তিনি লিখেছেন, ‘ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত আছে, ওয়াজিব এতেকাফ জামাআতের মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও বৈধ নয়; তবে নফল এতেকাফ সকল মসজিদেই জায়েয আছে।’

মহিলাদের এতেকাফের স্থান, তাদের ঘরের সালাতের জন্য নির্ধারিত জায়গা। সালাতের জন্য জায়গা নির্ধারিত না থাকলে এতেকাফে বসার সময় নির্ধারিত করে নিলেও সহীহ হবে।

এতেকাফের সময়

মানতের এতেকাফের জন্য রোযা রাখা শর্ত। সুতরাং মানতের এতেকাফের সময় কমপক্ষে একদিন। কারণ একদিনের কম সময়ে রোযা সহীহ হয় না। এ ছাড়া রমযানের শেষ দশদিন এতেকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাদায়ে কেফায়া। তৃতীয় আরেক প্রকার, নফল এতেকাফ। যার জন্য নির্ধারিত কোন দিন-ক্ষণ নেই। রোযা রাখাও এর জন্য শর্ত নয়। এ রকম এতেকাফ অল্প কয়েক মিনিটের জন্যও হতে পারে।এমনকি মসজিদে না বসে মসজিদ অতিক্রম করার সময় নিয়ত করলেও নফল এতেকাফ হয়।

এতেকাফের উপকারিতা ও ফযীলত

দুনিয়ার সবরকম ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে, নিভৃতে বসে আল্লাহর এবাদত করার উদ্দেশ্যে এতেকাফে বসা হয়। সে জন্য এতেকাফের উপকারিতা ও ফযীলত অপরিসীম। এতেকাফকারী পুরুষ বা মহিলা বহু ধরনের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। বান্দা এতেকাফ অবস্থায় আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থিত থাকে। এ জন্য আল্লাহর কাছে সে খুবই মর্যাদাসম্পন্ন হয় এবং এ ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার রহমত, অনুগ্রহ ও ক্ষমার আশাবাদী হয়। এতেকাফকারী ব্যক্তির চব্বিশ ঘণ্টা এবাদতের মধ্যে গণ্য হয়। যদিও ফারেগ সময়ে সে কোন এবাদত করে না।

‘আতা খোরাসানী রহ. বলেছেন, এতেকাফকারী সেই ব্যক্তির ন্যায়, যে নিজেকে আল্লাহর সম্মুখে ঢেলে দিয়েছে এবং বলছে, আমি এ স্থান ত্যাগ করব না, যতক্ষণ না আমাকে ক্ষমা করা হয়’।

‘এ জন্যও এতেকাফের গুরুত্ব অপরিসীম যে, এতেকাফের মধ্যে আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত স্থানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত ও লিপ্ত করার মাধ্যমে আল্লাহর সামনে নিজের অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। এতেকাফে অন্তর দুনিয়াবী বিষয় থেকে খালি হয়, নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা হয়, আল্লাহর কেল্লায় নিজেকে আবদ্ধ রাখা হয় এবং আল্লাহর ঘরে নিজেকে সবসময় সম্পৃক্ত রাখা হয়। এতেকাফকারী ব্যক্তি আল্লাহর ঘরের সঙ্গে নিজেকে স্থায়ীভাবে সম্পৃক্ত রাখে। যেন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। এতেকাফ সর্বশ্রেষ্ঠ আমল, যদি তা একনিষ্ঠতার সঙ্গে হয়।’

বান্দা যখন এতেকাফের নিয়তে নিজেকে মসজিদে আটকিয়ে রাখে, তখন যদিও সে সালাত, যিকির ও তিলাওয়াত ইত্যাদি এবাদতের মাধ্যমে বহু সওয়াব অর্জন করতে সক্ষম হয়, কিন্তু এর পাশাপাশি অনেক সওয়াবের কাজ থেকে সে বঞ্চিতও হয়। যেমন, সে রোগীর সেবা করতে পারে না, এতীম, বিধবা, নিঃস্বদের সহযোগিতা করতে পারে না, কোন মৃতব্যক্তির গোসল দিতে পারে না, জানাযার নামাযে
শরীক হতে পারে না, যেগুলো খুবই পুণ্যের কাজ বলে হাদীস শরীফে এসেছে। সে জন্য হাদীস শরীফে এতেকাফকারী ব্যক্তির জন্য এ সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, তার আমলনামায় সেই সব এবাদতের সওয়াবও লিখিত হবে, এতেকাফের কারণে যেগুলো থেকে সে বঞ্চিত হয়।

হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফকারী ব্যক্তি সম্পর্কে এরশাদ করেছেন,

هُوَ يعتَكِفُ الذُّنُوبَ، يَجرِى لَهٗ مِنَ الحَسَنَاتِ كَعَامِلِ الحَسَنَاتِ كُلِّهَا.

‘সে এতেকাফ এবং মসজিদে পাবন্দ থাকার কারণে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং তার নেকীর হিসাব সব ধরনের নেক কাজ সম্পাদনকারী ব্যক্তির ন্যায় জারি থাকে।’ (সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস ১৭৮১)

রমযানে এতেকাফের ফযীলত ও গুরুত্ব উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা সিদ্দীকা রা. বলেন,

كَانَ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِذَا دَخَلَ العشرَ اَحْى اللَّيْلَ وَاَيْقَظَ
اَهْلَهٗ وَجَدَّ وَشَدَّ الْمِئْزَرَ.

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের তৃতীয় দশক আগমন করলে সারারাত জাগ্রত থাকতেন, নিজের পরিবার-পরিজনকে জাগ্রত রাখতেন, খুব বেশি পরিশ্রম করতেন এবং উম্মুল মুমিনীন থেকে দূরে থাকতেন। (মুসলিম শরীফ, কিতাবুল এতেকাফ, ১: ৩৭২)

হযরত আয়শা সিদ্দীকা রা. আরও বলেন,

كَانَ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الْاَوَاخِرِ مَا لَا يَجْتَهِدُ فِى
غَيْرِهٖ.

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের তৃতীয় দশকে খুব বেশি পরিশ্রম করতেন, যে রকম পরিশ্রম অন্য সময়ে করতেন না।’ (মুসলিম শরীফ, কিতাবুল এতেকাফ, ১: ৩৭২)

হযরত আবু হোরায়রা রা. বলেন,

كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْتَكِفُ فِى كُلِّ رَمَضَانَ عَشْرَةَ اَيَّامٍ،
فَلَمَّا كَانَ الْعَامُ الَّذِىْ قُبِضَ فِيْهِ اِعْتَكَفَ عِشْرِيْنَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক রমযানে দশদিন এতেকাফ করতেন; কিন্তু যে বছর তিনি ইনতিকাল করেন, সে বছর বিশদিন এতেকাফ করেছেন। (বুখারী শরীফ, বাবুল এতেকাফ, ১: ২৭৪, হাদীস ২০৪৪)

হযরত উবাই ইবনে কাব রা. বলেন,

اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْاَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ،
فَسَافَرَ عَامًا، فَلَمَّا كَانَ مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ اِعْتَكَفَ عِشْرِيْنَ يَوْمًا.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা রমযানের শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন; কিন্তু এক বছর তিনি সফর করেছিলেন, সে জন্যে পরের বছর বিশদিন এতেকাফ করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস ১৭৭০)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

مَن اعتَكَفَ يَوْمًا اِبتغَاءَ وَجهِ اللهِ تَعَالٰى جَعَلَ اللهُ بَينَهٗ وَبينَ النَّارِ ثَلَاثَ
خَنَادِقَ اَبعَدَ مَا بَينَ الْخافِقَينِ.

যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এক দিন এতেকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আসমান ও যমীনের মাঝে যে পরিমাণ দূরত্ব আছে তার চেয়েও বেশি দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। (শুআবুল ঈমান, হাদীস ৩৯৬৫)

বিখ্যাত তাবিঈ হযরত নাফে রহ. বর্ণনা করেন,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْاَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ.
قَالَ نَافِعٌ: وَقَدْ اَرَانِىْ عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ اَلْمَكَانَ الَّذِىْ كَانَ
يَعْتَكِفُ فِيْهِ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন। নাফে বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. আমাকে মসজিদের সেই স্থানটি দেখিয়েছেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফ
করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস ১৭৭৩)

অপর একখানি হাদীসে রয়েছে,

عَنْ اِبْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّهٗ كَانَ اِذَا
اعْتَكَفَ طُرِحَ لَهٗ فِرَاشُهٗ اَوْ يُوْضَعُ لَهٗ سَرِيْرُهٗ وَرَاءَ اُسْطُوَانَةِ التَّوْبَةِ.

হযরত ইবনে ওমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এতেকাফ করতেন, তখন তাঁর জন্য বিছানা বিছানো হতো (আবু লুবাবা ইবনে মুনযির রা.-এর) তওবার খুঁটির ২৯ পাশে। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস ১৭৭৪)

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুর্কী তাঁবুতে রমযানুল মুবারকের প্রথম দশদিন এতেকাফ করেছেন, অতঃপর দ্বিতীয় দশকেও। এরপর তাঁবু থেকে মাথা বের করে বলেছেন, আমি এই (ক্বদরের) রাত্রির অনুসন্ধানে প্রথম দশদিন এতেকাফ করেছি, অতঃপর দ্বিতীয় দশদিনও। অতঃপর আমাকে বলা হলো, এ রাত্রিটি রমযানের শেষ দশকে। সুতরাং যে কেউ আমার সঙ্গে এতেকাফ করেছে, সে যেন শেষ দশদিনও এতেকাফ করে। আমাকে এ রাতটি দেখানো হয়েছিল, অতঃপর ভুলিয়ে দেওয়া হয়। (এ রাতের নিদর্শন এই যে,) আমি এ রাতের পরের ফজরে নিজেকে সিজদা করতে দেখেছি পানি ও কাদামাটিতে। সুতরাং এ বরকতময় রজনী অনুসন্ধান কর শেষ দশদিনের বেজোড় রাতগুলোতে।

বর্ণনাকারী বলেন, ঐ রাত্রিতে বৃষ্টি হয়েছিল। মসজিদের ছাদ খেজুরের ডালা দ্বারা ছাওয়া ছিল; সুতরাং মসজিদে পানি পড়েছে এবং (রমযানের) একুশ তারিখ সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কপাল মুবারকে আমি স্বচক্ষে কাদামাটির চিহ্ন দেখেছি। (মুসলিম শরীফ, হাদীস ১১৬৭)

ইবনে শিহাব যুহরী রহ. বলেছেন, আশ্চর্য লাগে, কিভাবে লোকেরা এতেকাফ ছেড়ে দিল! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক আমল করেছেন, আবার কখনো সে আমল ছেড়েও দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ওফাত পর্যন্ত কখনো এতেকাফ ছাড়েননি। (ইমাম সারাখসী, আল মাবসূত, ৩: ১১৪)

লেখক: মুফতী, শায়খুল হাদীস

সর্বশেষ সংবাদ

বাজেট অধিবেশন শুরু ২ জুন

আগামী ২ জুন থেকে শুরু হবে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন। মঙ্গলবার (১১ মে) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ শাখার পরিচালক...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ